গন্তব্য মুন্নার, চিরহরিৎ সর্পিল পাহাড়ি পথের যাত্রা

এদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত তৈরী হয়ে নিলাম, ব্যাগপত্তর তেমন খোলাই হয় নাই। কারন রাতে খেয়েই ঘুমাতে গিয়েছিলাম, তাই সকাল আটটার মধ্যে হোটেলে রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিয়ে রওনা হলাম কোচিন থেকে মুন্নার এর উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে পথে দেখব দুটো ঝর্না আর বিকেল কাটাবো একটা চমৎকার লোকেশনে। আমাদের সেভেন সিটার ইনোভা গাড়ী করে রওনা হয়ে গেলাম আমাদের চারজনের দলটি, সাথে আমাদের গাইড কাম ড্রাইভার মিঃ বিনয় পি. জোস। 

আমাদের প্রথম গন্তব্য Cheeyappara Waterfalls, এটি কোচিন থেকে কোচি-মাদুরাই-তন্ডি পয়েন্ট নামক একটা জায়গা, যা মূলত Chillithodu, Keralaয় পড়েছে। আমাদের রাতের নিবাস ‘হোটেল ক্যাসেল রক’ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আমাদের গাড়ীতে যাত্রী চারজন, সিট সাতটি; তাই পেছনের ট্রিপল সিটে না বসে থেকে আমি সেখানে ঘুমানোর আয়োজন করে নিলাম কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে। মিঃ বিনয় ব্যাকভিউ মিররে তা দেখে বলল, পেছনেই সিটের নীচে তার বিছানাপত্তর এর সাথে বালিশ রয়েছে, চাইলে নিয়ে নিতে পারি। 

এ তো সোনায় সোহাগা, ফলে সকালের রৌদ্রজ্জ্বল আলোয় চোখ বুজে পেছনের সিটে গান শুনতে শুনতে আমি চললাম শুয়ে শুয়ে, সঙ্গীরাও কেউ ঝিমুচ্ছে, কেউ গান শুনছে। প্রায় ঘন্টা তিনেকের যাত্রা শেষে আমরা এসে পৌঁছলাম Cheeyappara Waterfalls এ; কারন পথিমধ্যে সিমকার্ড এবং ডলার ভাঙ্গানোর জন্য দুবার যাত্রা বিরতি দিয়েছি, চলেছে চা পানের বিরতিও। 

দুপুর সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমরা যখন এই ঝর্ণায় এলাম, তখন পর্যটকে ভরে গেছে। মূলত একটা হাইওয়ে রোড চলে গেছে দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, কোচিন আর নাড়ুকানি এর মাঝে যে ন্যাশনাল হাইওয়ে রয়েছে, তার একপাশে এই পাহাড়ি ঝর্ণা, যা এই অক্টোবর মাসেও পানিপূর্ণ! এই ঝর্ণাটি আমাদের বাংলাদেশের খৈয়াছড়া ঝর্ণার মত, সাত স্তরে নেমে এসেছে। পাথুরে পাহাড় হতে সৃষ্ট হয়ে ঘন চিরহরিৎ বনের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়েছে। এখানে থেমে চলল ছবি তোলা, আমি এই ফাঁকে আশেপাশে ঘুরে দেখলাম, রাস্তার উপর বসা নানান দোকানপাট শেষে একটু দূরে মিলল একটি রেস্টুরেন্ট, নাম ‘আলিবাবা রেস্টুরেন্ট’ সাথে হালাল ট্যাগ করা। 

যেহেতু আমরা এখন লাঞ্চ করবো না, তাই ভ্রমণসঙ্গীদের জন্য এখান হতে কেরালার লোকাল ব্র্যান্ডের আইসক্রিম কিনে নিলাম। এই ঝর্ণার অতি সন্নিকটেই রয়েছে আরেকটা ঝর্ণা, নাম Valara waterfalls। এটিও সবুজ বনভূমি ভেদ করে বয়ে যাওয়া একটি ঝর্ণা। এই ঝর্ণার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এখানে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখী এবং বন্য প্রানীর, যেই বনের মাঝ দিয়ে ঝর্ণাটি বয়ে গেছে। এই এলাকায় অবস্থিত হোটেলে রাত্রি যাপন করে থাকেন, সময় নিয়ে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু যেহেতু, আমাদের শিডিউল একটু টাইট ছিল, তাই আমরা ঘন্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে রওনা হলাম মুন্নার, ভুবন বিখ্যাত টি এস্টেট, এর উদ্দেশ্যে। 

দুপুর আড়াইটা নাগাদ আমাদের গাড়ী থামানো হল Hotel Tamarind নামক একটি রোড সাইড রেস্টুরেন্টে, লাঞ্চ এর জন্য। আমি সকালবেলাই মিঃ বিনয়কে বলে দিয়েছিলাম আমি প্রতিদিন দুপুরে সে যে মেন্যু খাবে, তাই খাব। আমার উদ্দেশ্য ছিল, রিয়েল কেরালা ফুডস ট্রাই করে দেখা। যাওয়ার আগে থেকে কেরালার খাওয়া আর গরম নিয়ে এতো নেগেটিভ কথা শুনেছিলাম যে, আমি সত্যি আগ্রহী ছিলাম খাবার সমস্যাটা বুঝার জন্য। আর গরম নিয়ে সমস্যা হয় নাই, কারন সারাক্ষণ গাড়ীতে এসি ছিল, আর আর সাইট সিয়িং এর সময় তেমন সমস্যা হয় নাই। শুধুমাত্র আলিপ্পে আর কুমারোকাম এ একটু টের পেয়েছি, এই অক্টোবর মাসেও প্রায় পঁয়ত্রিশ চল্লিশ ডিগ্রী টেম্পারেচার! 

কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারটায় মজা পেয়েছি। আসলে সমস্যা হল আমাদের অভ্যাস, আর জিহবার। আমি আমার প্রতিটি ভ্রমণে দেখেছি, আমাদের বাংলাদেশের ভ্রমণকারী যেখানেই যাক না কেন, সে এই দেশের খাবার এবং তার স্বাদ খুঁজে বেড়ায় ভিনদেশী খাবারে। কাশ্মীরি রোগান জোশ বা গুস্তাবায় আমাদের দেশীয় কোরমা বা রেজালার মত গ্রেভী কেন নাই, সেটা নিয়ে গবেষণা করে। কেরালার খাবারে সমস্যা দুটো, একটি হল নারিকেল এবং নারিকেল তেল ব্যবহার হয় বেশী; আর বিশেষ কিছু মসলা খুব কমন, যা দিতেই হবে এমনটা, যেমন আমাদের দেশে হলুদ-মরিচ, এরকম একটি মসলা হল তারার মত দেখতে Star Anise তথা মৌরির একটি বিশেষ জাত ব্যবহৃত হয়, যার স্বাদের সাথে আমরা তথা আমাদের জিহ্বা অভ্যস্ত নয়। আর এই মসলাটি প্রায় সব খাবারেই ওরা ব্যবহার করে।

এই মসলা আর নারিকেল তেলের কারনে স্বাদে ভিন্নতা আসবেই। আমার কথা হচ্ছে, কাশ্মীর, কেরালা থেকে শুরু করে ইউরোপ আফ্রিকা যেখানে যাব, সেখানকার স্বাদে খাবার খাব, উপভোগ করার চেষ্টা করতে হবে সেই খাবারের, খাবারের স্বাদের। আমার পরিচিত খাবারের সাথে মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করাটাই আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। যাই হোক আমি যথারীতি কেরালার সেট থালি অর্ডার করলাম। অন্যরা তাদের মত। খাওয়া আমরা ফের আমাদের যাত্রা অব্যাহত রাখলাম মুন্নার এর পথে। 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নাগাদ পাহাড়ি রাস্তায়  উঠলো আমাদের গাড়ী। চিরহরিৎ পাহাড়ি রাস্তা, পাহাড়ের গা বেয়ে এই উঠছে তো এই নামছে। যে কোন পাহাড়ি রাস্তড়ী। চিরহরিৎ পাহাড়ি রাস্তা, পাহাড়ের গা বেয়ে এই উঠছে তো এই নামছে। যে কোন পাহাড়ি রাস্তায় জার্নি আমার ভাল লাগে, ভয় করে না কেন জানি। মজার ব্যাপার আমার কিন্তু হাইট ফোবিয়া আছে, কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় সেটা কাজ করে না। আসলেই কি ফোবিয়া আছে? এটাই এখন আমার কাছে সন্দেহ হয়।

যাই হোক বিকেল বেলা আমাদের গাড়ী থামলো একটা ভিউ পয়েন্টে, নাম Karadippara view point যাকে অনেকে Karadippara Photo Point বলেও অভিহিত করে থাকে। এর অবস্থানঃ Ikka Nagar, Munnar, Kerala। এখানে একটি রেস্টুরেন্টকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভিউ পয়েন্টটি।  রেস্টুরেন্টের নীচে সুন্দর একটি বাউন্ডারি দেয়া পাহাড়ের খাঁজে ভিউপয়েন্ট, বহু দেশী-বিদেশী পর্যটক ইতোমধ্যে সেখানে আসন গেড়েছে। আমরা সেখানে ফাঁকা দেখে একটি টেবিল খোঁজ করে নিজেদের আস্তানা গেড়ে নিলাম। এরপর ধোসা, চিপস আর চা এর অর্ডার দিয়ে সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। 

এসময় আমি দেখি আমার চিপসের প্যাকেটের দিকে একটি বানর মায়া ভরা চাহনীতে চেয়ে আছে। আমি একটা চিপস নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম, হাত বাড়িয়ে দিতেই সে সুন্দর নিয়ে চিবুতে লাগল। আবার আরেকটা দিলাম, সে নিল। এসময় আমার ভ্রমণ সাথী রনী’র হাতে ছিল চিপসের প্যাকেট, ও টেবিলে বসেছিল, গলায় তার ক্যামেরা। তাকে বললাম বানরের চিপস নেয়ার ছবি তুলতে।

ও যখন ছবি তুলছে, তখন হঠাৎ চারিদিকে হাসির রোল। ঘুরে দেখি, একটা বড় সাইজের বানর এই ফাঁকে আমাদের টেবিল হতে পুরো চিপসের প্যাকেট নিয়ে ছাউনির সিলিং হতে ঝুলে পড়ে আমাদের ভংচি কাটছে আর চেচাচ্ছে। ঘটনা উপলব্ধি করে আমরাও হেসে দিলাম। বানরটা খুব ইন্টেলেকচুয়াল, বুঝাই যাচ্ছে, সে আমাদের ফলো করছিল। তার দলের কাউকে একটা একটা করে চিপস দিচ্ছি, এটা তার সহ্য হয় নাই, তাই সে পুরো প্যাকেটই হাপিস করে দিল...

সেখান হতে সন্ধ্যে হয় হয় সময়ে আমরা রওনা হলাম আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে। মুন্নারে আমাদের দুই রাত্রের নিবাস ছিল "Spice Country Resort"। সন্ধ্যের পরপর সেখানে আমরা পৌঁছে গেলাম। পৌঁছে আমাদের রুম বুকিং এর কথা রিসিপশনে বলতেই আমদের চাবি ধরিয়ে দিল, রুম -৫ম তলায়, মাইনাস ফিফথ ফ্লোর... আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম, বলে কি! আসলে পাহাড়ের ঢালে গড়ে তোলা দশতলা ভবনের অস্টমতলা এসে মিশেছে মেইন রোডের সাথে, আর এখানেই রিসিপশন। ফলে এটাকে জিরো ধরে, উপরে ফার্স্ট ফ্লোর আর নীচে মাইনাস সেভেন্থ ফ্লোর পর্যন্ত। 

যাই হোক আমরা আমাদের চাবি নিয়ে রুমে চলে এলাম। প্রতিটি রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা, সেখানে চেয়ার দেয়া আছে। রাতের আধারেই বুঝলাম সামনে ভ্যালী, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা। দূরের পাহাড়ের গায়ে গায়ে বেশকিছু বৈদ্যুতিক বাতির আলোর মেলা দেখা যায়, প্রতিটি আবাসিক হোটেল, মাঝে মাঝে স্থানীয়দের নিবাস হয়ত। আর ভ্যালীর পুরোটা জুড়েই স্থানীয়দের বাড়িঘর। আমরা ফ্রেশ হয়ে রুমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম হোটেলের রেস্টুরেন্টেই, মেনু বাঙালী টেস্ট এর জন্য (ভ্রমণসাথীদের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে) ভাত, ডাল, সবজি, চিকেন। 

ব্যাস আর কি, রাতের খাবার শেষে যার যার রুমে। আমি ঘন্টা দুয়েক রনী’র সাথে আমাদের রুমের বারান্দায় বসে গল্প করলাম, আর সাথে উপভোগ করলাম রাতের পাহাড়ি নির্জনতা আর নিস্তব্ধতা। 

(চলবে...)

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ