একদিনে ফরিদপুর ভ্রমণ: ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নদীর সান্নিধ্যে এক দিনের যাত্রা
ফরিদপুর—পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের জেলা, নদী-নালা আর জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যে ভরা এক জনপদ। পদ্মা ও মধুমতির তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই শহর একদিকে যেমন ইতিহাসের স্মৃতি ধারণ করে রেখেছে, তেমনি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক উজ্জ্বল কেন্দ্র।
ঢাকার কোলাহল থেকে একদিনের জন্য একটু শান্তি, প্রকৃতি আর ইতিহাসের স্পর্শ খুঁজতে আমি ভোরবেলা একাই রওনা দিলাম ফরিদপুরের পথে।
ভোরের যাত্রা: ঢাকা থেকে ফরিদপুর
ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে পৌঁছে ভোর ৭:০০টার বাসে উঠলাম “গোল্ডেন লাইন” পরিবহন অথবা বিআরটিসি বাসে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। ঢাকা থেকে ফরিদপুরের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার; পথে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সুবাদে এখন তিন ঘণ্টার পথ খুবই সহজ।
সকাল: ইতিহাসের ছোঁয়া
পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি (১০:০০ এ.এম.)
প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিলাম ফরিদপুর সদরের গোপালপুরে অবস্থিত পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি।
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়েই যেন মনে হচ্ছিল—‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর সেই পল্লীজীবন জীবন্ত হয়ে আছে। ছোট্ট জাদুঘরটিতে কবির হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত সামগ্রী ও নানা স্মারক সংরক্ষিত আছে।
হযরত শাহ মকদুম মাজার (১০:৪৫ এ.এম.)
এরপর রওনা দিলাম ফরিদপুর শহরের ঐতিহাসিক শাহ মকদুম মাজারে। ১৭শ শতকে নির্মিত এই মাজারে প্রতিদিন শত শত ভক্তের আগমন ঘটে। ধর্মীয় শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক প্রশান্ত পরিবেশ।
বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি যাদুঘর (১১:১৫ এ.এম.)
ফরিদপুরেরই আরেক সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফের স্মৃতি সংরক্ষিত আছে এই যাদুঘরে। যুদ্ধকালীন ইতিহাসের সাক্ষী নানান নিদর্শন এখানে রাখা আছে। দেশপ্রেমে মন ভরে গেল।
দুপুরের আগে: জমিদার ও ধর্মীয় স্থাপনা দর্শন
২২ রশি জমিদার বাড়ি (১১:৪৫ এ.এম.)
Sadarpur উপজেলার বৈষরাশি গ্রামের জমিদার বাড়িটি ১৮ শতকের স্থাপত্যে ভরপুর। নামকরণ “২২ রশি” এসেছে বিশাল বাড়ির প্রাসাদসম কক্ষগুলোকে ঘিরে থাকা বড় লোহার রশি বেষ্টনী থেকে। পুরোনো দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ইতিহাস যেন কথা বলে।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল, আটরশি (১২:০০ এ.এম.)
আলফাডাঙ্গা রোড ধরে যাত্রা করলাম বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে—এক বিশাল ধর্মীয় কমপ্লেক্স। এখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে জিকির-মাহফিলে। শান্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার পথে নামলাম।
দুপুরের খাবার (০২:১৫ পি.এম.)
ফরিদপুর শহরের “রাজধনী রেস্টুরেন্ট”-এ খিচুড়ি ও চিকেন রোস্টে দুপুরের ভোজ। স্থানীয় মিষ্টি “ফরিদপুরের রসমালাই” অবশ্যই চেষ্টা করলাম!
কানাইপুর জমিদার বাড়ি (০২:৪৫ এ.এম.)
কানাইপুর গ্রামের প্রাচীন জমিদার বাড়ির স্থাপত্য ইউরোপীয় ধাঁচে নির্মিত। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর দৃশ্য মন ছুঁয়ে যায়।
বিকেল: স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
পাতরাইল মসজিদ (০৪:০০ পি.এম.)
ফরিদপুর সদর থেকে ১৫ কিমি দূরে ১৫শ শতাব্দীর ঐতিহাসিক পাতরাইল মসজিদ। লাল ইট ও পাথরের মিশ্রণে নির্মিত এই স্থাপনাটি মোঘল স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ।
সাতৈর মসজিদ (০৪:৪৫ পি.এম.)
নগরকান্দা উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চমৎকার টেরাকোটা নকশা ও পুরনো গম্বুজে ইতিহাসের ছাপ স্পষ্ট।
মথুরাপুর দেউল (২:০০ পি.এম.)
ফরিদপুরের মথুরাপুর গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন দেউলটি হিন্দু স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। সূক্ষ্ম টেরাকোটা কারুকাজ, সূর্যের আলোয় ঝলমল করা লাল ইট—চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য।
তোতা হাজী মসজিদ (২:৪৫ পি.এম.)
১৫শ শতকের শেষের দিকের এই মসজিদটি স্থানীয় মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন। ছোট হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক।
সন্ধ্যার প্রান্তে: নদী ও সূর্যাস্তের রঙে
কামারখালী ব্রিজ (৩:৩০ পি.এম.)
মধুমতি নদীর ওপর নির্মিত কামারখালী ব্রিজ ফরিদপুর জেলার এক ল্যান্ডমার্ক। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে দেখা নদীর স্রোত, বাতাস, আর সূর্যের সোনালি আলো—মুগ্ধকর।
আকোটের চর (৪:৩০ পি.এম.)
নদী পার হয়ে স্থানীয় নৌকায় গেলাম আকোটের চরে। চরজমির সবুজে ঘেরা প্রকৃতি, পদ্মা-মধুমতির মিলনধারা—দিনশেষে এই জায়গাটিই ভ্রমণের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ অংশ।
চর থেকে সূর্যাস্ত দেখেই ফেরত রওনা দিলাম ফরিদপুর শহরের পথে।
ফেরার যাত্রা: রাতের পথ, মুগ্ধ স্মৃতি
সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বাসে উঠলাম। রাত ৯টার মধ্যে গাবতলীতে পৌঁছে রিকশায় লালবাগ ফিরে এলাম।
পুরো দিনজুড়ে ১২টি ঐতিহাসিক স্থান, ধর্মীয় নিদর্শন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘুরে আমি যেন সময়ের নদী পাড়ি দিয়েছি।
খরচের হিসাব (আনুমানিক)
| খাত | টাকা (৳) |
|---|---|
| ঢাকা–ফরিদপুর বাস (রাউন্ড ট্রিপ) | ৬০০ |
| স্থানীয় সিএনজি/টেম্পু ভাড়া | ৮০০ |
| নৌকা (আকোটের চর) | ২০০ |
| নাস্তা + লাঞ্চ + চা | ৫০০ |
| প্রবেশ/অনুদান | ১০০ |
| রিজার্ভ টেম্পু বা অতিরিক্ত খরচ | ৮০০ |
| মোট আনুমানিক খরচ | ৳৩,০০০ – ৳৩,৫০০ |
ভ্রমণ টিপস
-
ভোরে যাত্রা করুন, কারণ দূরের স্থানগুলো সময়সাপেক্ষ।
-
একটি টেম্পু বা সিএনজি পুরো দিনের জন্য রিজার্ভ নিলে সময় বাঁচবে।
-
পানি ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন।
-
মাজার বা ধর্মীয় স্থানে পোশাক ও আচরণে সংযম রাখুন।
-
আকোটের চর সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে সুন্দর—সময়ের হিসাব রাখুন।
উপসংহার
ফরিদপুর একদিকে সাহিত্য, অন্যদিকে ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মিলনভূমি।
পল্লী কবির গ্রাম থেকে শুরু করে জমিদারদের স্থাপত্য, মসজিদ থেকে দেউল—সব জায়গাতেই এক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে।
একদিনের এই যাত্রা আমাকে শুধু স্থাপত্য বা প্রকৃতির নয়, ইতিহাসের কাছেও নিয়ে গেল।
ঢাকা থেকে সহজেই যাওয়া যায় এমন এই জেলা, নিঃসন্দেহে এক অনন্য ডে ট্রিপ গন্তব্য।
মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

মন্তব্যসমূহ