যাত্রা শুরুর গল্প (একযুগ পর হাওরের উদ্দেশ্যে যাত্রা - পর্ব ০২)


অফিস থেকে বের হয়ে আধঘন্টার উপরে দাঁড়িয়ে থেকেও কোন বাস পাচ্ছিলাম না, সবকয়টি এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টের রাস্তায় গিয়ে নামবে। প্রায় পৌনে একঘন্টা পরে একটা প্রাইভেট কার এসে থামলো, মাত্র ৬০ টাকার বিনিময়ে উনি আমরা চারজন অপেক্ষমাণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে রাজি হলো। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মাত্র ১৫ মিনিটে চলে এলাম কুড়িল-বিশ্বরোড সংলগ্ন বিআরটিসি বাস কাউন্টারে। অফিস থেকে আর্লি লিভ না নিয়ে, হাফ-ডে লিভ নিলাম চেয়ারম্যান স্যারকে বলে দুপুর আড়াইটার পরে বের হয়েছিলাম। উদ্দেশ্য বিকেল চারটায়ই শিপে চেকইন করে শুরু থেকে প্রোগ্রামের অংশ হওয়া। পৌণে চারটায় বাস ছাড়লো ভুলতা গাউসিয়ার উদ্দেশ্যে। সোয়া চারটা নাগাদ কাঞ্চন ব্রিজ স্টপেজে নেমে অটোরিকশা নিয়ে চলে এলাম পার্ল হার্ভার ঘাটে। কিন্তু এই ঘাটে নোঙ্গর করে না আমার কাঙ্খিত শিপ এম ভি টাঙ্গুয়ার হাওর। গুগল ম্যাপে দেখলাম ৭০০ মিটার দূরে, মিনিট দশেক কানে হেডফোন গুজে গান শুনতে শুনতে  হেঁটে হেঁটে চলে এলাম মেরিনা অস্ট্রিচ হারবার ঘাটে। 

ঘাটে দাঁড়িয়ে রাজীব ভাইকে ফোন দিলে উনি এসে রিসিভ করলেন, সরাসরি চার রাতের আবাস ১১৩ নাম্বার রুমে নিয়ে গেলেন, রুমমেট রাজীব ভাই নিজে; সাথে শাকিল ভাই এবং বিকাশ ভাই, উনাদের সাথে এই প্রথম পরিচয়। তখনো উনারা দুজন পৌঁছান নাই। মিনিট পনেরোর মধ্যে উনারাও চলে এলেন। ফ্রেশ হয়ে দোতলার ডাইনিং এরিয়াতে অনুষ্ঠিতব্য এই হাওর সামিট ২০২৬ এর ১ম সেশন শুরু হলো পাঁচটার পর। এই ফাঁকে আসরের নামাজ পড়ে নিলাম শিপের ছাদে। ১ম সেশনের আলোচ্য বিষয় ছিলোঃ "হাওরের জীবন, প্রতিবেশ, জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, অভিযোজন ও সম্ভাবনা"। এই সেশনের কিনোট স্পিকার ছিলেন জনাব কাশ্মীর রেজা, বিশিষ্ট হাওর গবেষক, লেখক এবং সংগঠক। মাগরিবের নামাজের পর সান্ধ্যকালীন নাস্তায় ছিলো চাউমিন আর পেয়ারা মাখা সাথে পাণীয় হিসেবে চা/কফি। সাতটার পরে শিপের খোলা ছাঁদে বেশ কিছুটা সময় নামাজ পড়ার কার্পেটে শুয়ে থেকে কানে হেডফোন গুঁজে আকাশে সপ্তমীর চাঁদের সাথে মেঘেদের লুকোচুরি খেলা দেখলাম। এর মাঝে তারারূপী স্যাটেলাইটদের ছুটে যাওয়া চোখে পড়লো মিনিট দশেক পরপর।

রাত নয়টায় সেশন ছিলো আরেকটা, যার প্রতিপাদ্য ছিলোঃ "পরিবেশবান্ধব হাওর ভ্রমণ এবং আমাদের করণীয়",, যার মূলবক্তা ছিলেন অপু নজরুল। এই সেশন এর আলোচনার সারাংশ 'ডিম আগে না মুরগী আগে'র মতো। পরিবেশবাদীদের অভিমত অনুসারে Mass Tourism করা সম্ভব নয়, আবার Mass Tourism এর কারণে হাওরের ইকোসিস্টেম এবং জীব-বৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন তা অনস্বীকার্য। 

রাত দশটা নাগাদ এই সেশন শেষে ডিনার পরিবেশন করা হয়। মেন্যুতে ছিলো সাদা ভাত, আলু ভর্তা, সবজি ভাজি, মাছের দোপেয়াজা, মুরগীর কারি, ঘন ডাল, সালাদ, মিষ্টি দই। ভরপেট ভোজন শেষে মেঘলা আকাশের নীচে মধ্যরাত পর্যন্ত  হেডফোনে প্রিয়সব গান শুনতে শুনতে রাতের নদীপথের যাত্রাটুকু উপভোগ করতে লাগলাম। রাত বারোটার পরে রুমে গিয়ে ঘুমাতে গেলাম। খুব একটা খারাপ কাটলো না প্রথম দিনটি। 

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ