অফুরান অবকাশ (একযুগ পর হাওরের উদ্দেশ্যে যাত্রা - পর্ব ০৩)

বাস্তব জীবনের রোজকার রোবটিক রুটিন এর চক্র থেকে বাইরে থাকলেও দেহঘড়ি ঠিকই রোজকার নির্দিষ্ট সময়ে জাগিয়ে দিলো। কিছুটা সময় বিছানায় শুয়ে থেকে একসময় বাধ্য হয়ে উঠে পড়লাম ফ্রেশ হয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। শিডিউলড নাস্তার সময় সকাল আটটা থেকে নয়টা। এরপর দ্বিতীয় দিনের সেশন শুরু হবে। নাস্তার মেনুতে ছিলো পরাটা, ডিমভাজা, সবজি, ডাল, সুজির হালুয়া। এরবাইরে ইউরোপীয় ব্রেকফাস্ট হিসেবে ছিলো ব্রেড, বাটার, জ্যাম, জেলি, সুন্দরবনের মধু। পাণীয় সারাদিনের সেই চা/কফি। 

নাস্তা শেষ করে কড়া এককাপ কফি নিয়ে ছাদে উঠে গেলাম। কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে প্রিয়সব গানের সাথে দিনের প্রথম পাণীয় হাতে নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটালাম। বেলা দশটার দিকে আজকের সেমিনার শুরু হলে নীচে নেমে আসলাম। 

আজকের সকালের সেশন এর আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলোঃ "হাওরে জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রভাব ও অভিযোজন কৌশল"। আলোচনায় রিসোর্স পারসন তুলে ধরেন জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষ্য সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের কারনে হাওরের জীববৈচিত্রে কিরকম প্রভাব ফেলছে। আর এই বিরূপ পরিস্থিতিতে প্রকৃতি তার অভিযোজন কৌশলে কিভাবে উদ্ভিদ, প্রাণী, পাখি এবং মাছের জীবম বিপন্ন হচ্ছে। 

বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ সেশন শেষে স্ন্যাক্স হিসেবে কেক আর কলা পরিবেশন করা হয়। স্ন্যাকস আর কফি পাণ করে গোসল করে জুম্মা নামাজের জন্য একটা গ্রামের অদূরে নোঙর করলো আমাদের জলযান " এমভি টাঙ্গুয়ার হাওড়"।  এরপর সাথে থাকা ছোট ইঞ্জিন নৌকায় করে রওনা হলাম সেই গ্রামের ঘাটে। বেলা দেড়টায় জুম্মা নামাজ শেষে ফেরার সময় পড়লাম বিপাকে। আমাদের ছোট ইঞ্জিন নৌকা নাব্যতার ঘাটতি থাকায় ডুবো জমিতে আটিকে গেছে। এরপর সেই গ্রামের ঘাটে থাকা দুটো সরু নৌকায় করে কয়েক ধাপে একে একে সবাই ব্যাক করলাম শিপে। সবার শেষ দলে আমি ব্যাক করার সময় দেখি সেই ইঞ্জিন নৌকা মুক্ত হয়েছে। আর এদিকে সরু নৌকায় হাঁটু ভেঙে বসে নৌকার দুই ধার দুই হাতে চেপে ধরে ভয়ে দোয়া দুরুদ পড়ছিলাম, হা হা হা.

বোটে ফিরে দুপুরের লাঞ্চ করলাম দুপুর আড়াইটার দিকে। আজকের মেন্যু ছিলো গরুর মাংস, বোয়াল মাছ, করলা ভাজি, দুই পদের ভর্তা, ডাল, সালাদ, টকদই। এরপর দুপুরের অলস সময়ে দ্বিতীয়বার মূল শিপ থেকে ইঞ্জিন নৌকা করে ইটনা গিয়েছিলাম। ১মবার জুম্মা নামাজ পড়তে, আর ২য়বার দুপুরের খাবারের পর মিষ্টি চাখতে। কিশোরগঞ্জের ইটনা বাজারের বিজয় কৃষ্ণ ঘোষ এর "বাজিতপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার" এ। আমি, Nazmul H Razib, শাকিল ভাই, বিকাশ দা সহ আরও দুজন। রসমলাইটা দারুণ ছিলো, এরপর রসগোল্লা চেখেছি, ফ্রেশ সাদামাটা স্বাদের। বাকীরা এরপর চমচম সহ আরও দুয়েক পদ চেখে দেখলেও আমার ভরপেটে "আর ঠাঁই নাইরে..." অবস্থার কারণে আমি ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলাম।

এরপর দুপুর থেকে শেষ বিকেলের আগ পর্যন্ত রুমে বসে টুয়েন্টি নাইন কার্ড গেম খেলে সময় কাটালাম। এরপর ৫টার দিকে ছাদে গিয়ে আসরের নামাজ শেষে অদ্ভুত আবির মাখা পশ্চিমাকাশে সূর্যাস্ত দেখলাম, যদিও সরাসরি সূর্যের দেখা পাই নাই, কিন্তু তার লালিমা মাখা পুরো আকাশ সন্ধ্যা মিইয়ে গিয়ে রাতের আঁধারের ঝাঁপি নেমে আসার আগ পর্যন্ত সবাইকে মুগ্ধ করেছে। মাগরিবের নামাজের পর গতকালের মতো মাদুরে শুয়ে গান শুনতে শুনতে রাতের আকাশ দেখে সময় কাটালাম। এর মাঝে ছোট স্পিকারে লো ভলিউমে বাংলা ফোক গান বাজানো হলো। যদিও হাওরের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য নিয়েই এই "হাওর সামিট"। আসলে হাজার হলেও আমরা মানুষ তো!

রাত আটটায় শুরু হলো সেমিনার, এই সেশনের বিষয়ঃ "হাওরভিত্তিক পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা"। কি-নোট স্পিকার ছিলেন WARPO প্রতিনিধি। তিনি সরকারের এ০ই বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা, পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ সমূহ তুলে ধরেন। এরপর আরেকটি সেমিনার ছিল, যার প্রতিপাদ্য ছিলো "হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনা", আলোচনায় ছিলেন, প্রফেসর ড. মোঃ মনজুরুল কিবরিয়া। তথ্যপূর্ণ এই সেশনে হাওর এবং এর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে যেমন জেনেছি, তেমন করেই অবগত হয়েছি কিভাবে এগুলো হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং অনেক প্রজাতি বিপন্ন হতে হতে বিলুপ্তির পথে।

সেমিনার শেষ হতে হতে ঘড়ির কাঁটা দশটা পার হয়ে গেলে শুরু হয় ডিনার এর পালা। আজকের চাইনিজ আইটেম এর মেন্যুতে ছিলো ফ্রাইড রাইস, প্রণ ফ্রাই, চিলি চিকেন, মিক্সড ভেজিটেবল, সাথে মিষ্টি দই। রাতের খাবার শেষে ছাদে বেশ কিছুটা সময় গান শুনে কাটিয়ে রুমে চলে এলাম। গল্পগুজব করতে করতে রাত বারোটা পার হয়ে গেলে ঘুমাতে গেলাম।

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ