লাংকাউই ভ্রমণ ২০২৬ - দিন ০১

সারাদিন অফিস করে আর্লি লিভ নিয়ে বিকেল চারটায় অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় পৌঁছলাম বিকেল পাঁচটায়। প্ল্যানিং এর শুরুতে করা ছোট্ট ভুলের কারনে হ্যান্ড লাগেজ নিতে হচ্ছে, যার সাকুল্যে ওজন ৭ কেজির কম, এর মধ্যে ব্যাগেরই ওজন দেড় কেজি, ২০১৯ সালে কলকাতার শ্রী লেদার্স থেকে কেনা। বাসায় ফিরে পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড, ভিসা, হোটেল বুকিং, এয়ার টিকেটসগুলোর সব গুছাতে গুছাতে ইফতারের সময় হয়ে গেল। ইফতার আর মাগরিবের নামাজ শেষ করে এককাপ চা পাণ করে বাসা থেকে বের হলাম, উবার কল করে। প্ল্যান ছিলো বিমানবন্দর জামে মসজিদে তারাবিহর নামাজ পড়া। সোয়া আটটার আগে আগে সেখানে পৌঁছে দেখি জামাত পৌনে আটটায়!!! ভাগ্য খারাপ, ১২ রাকাত তারাবিহ পেলাম। নামাজ শেষে বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে বসে রইলাম। রাত ১২:৫০ এর মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট ছাড়লো রাত পৌনে দুটায়। ডিনার কাম সেহেরিতে ফ্রাইড রাইস আর বিফ দিলো, কেমন টক স্বাদের ফ্রাইড রাইসটা ভালো লাগে নাই। তবে ছোট ছোট কিউব করে কাটা আলুসেদ্ধ সরিষা তেল আর ধনেপাতা দিয়ে মাখানো একটা আইটেম ছিলো, সেটা খুব ভালো লেগেছে। ডেজার্টের পায়েসটাও মন্দ ছিলো না। এই খাবার খেয়ে ডিনার-সেহেরি একসাথে শেষ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ঘুম এলো না। একসময় রাতের আধাঁর কেটে আন্দামান সাগরের দিগন্তরেখা ছুয়ে লাল আবিরের দেখা মিললো। 

সাড়ে সাতটায় প্লেন ল্যান্ড করতেই হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ইমিগ্রেশনে গিয়ে দেখি লম্বা লাইন। এই সাত সকালেই প্রায় ২০টা প্লেন ল্যান্ড করেছে। এর মধ্যে সাউথ এশিয়ান বেশী, ঢাকা, কোচিন, দিল্লি সহ বেশ কিছু জায়গার একাধিক ফ্লাইট ছিলো। আর সেই কারণেই কি না, ইমিগ্রেশন অফিসার বেশী সময় নিচ্ছিলো। আমার এয়ার এশিয়ার লাংকাউই এর ফ্লাইট দশটায়, টার্মিনাল ২ থেকে, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স নেমেছে টার্মিনাল ১ এ। পৌণে নয়টার পরে ইমিগ্রেশন শেষ করে ট্রানজিট বাস খুঁজতে খুঁজতে নয়টা পেড়িয়ে গেল। অথচ আমার কাছে বন্ধু আপনের দেয়া র‍্যাপিড পাস ছিলো। আমি ডলার ভাঙতে পারি নাই বলে সাথে রিংগিত নেই, তাই কেএল এক্সপ্রেস এ উঠি নাই; অথচ র‍্যাপিড পাস দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারতাম। ট্রাঞ্জিট বাসে সোয়া নয়টায় টার্মিনাল টুতে গিয়ে শুনি ৯টা ছিলো বোর্ডিং পাস নেয়ার শেষ সময়। তারা বললো, তুমি অনলাইনে চেকইন করে বোর্ডিং পাস নিয়ে নিলেই পারতা। যাই হোক, ট্যুরের শুরুতে প্যারা নিয়ে কিছু অর্থ গচ্চা দিয়ে বেলা সাড়ে এগারোটার ফ্লাইটের নতুন টিকেট কেটে কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাউই রওনা দিয়ে সাড়ে বারোটার পর পৌঁছে গেলাম। আসলে ট্যুর প্ল্যানের শুরুতে এয়ার এশিয়ার এই টিকেট করার সময় থেকেই মনে হচ্ছিলো ঝামেলা একটা হবে। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এ একই পিএনআর এ টিকেট করলে এই যন্ত্রণা হতো না। 

বিমানবন্দরে গেট লাউঞ্চে বছর বাইশ তেইশ এর দুই বাংলাদেশী ভাই, আকিব আর রাকিব এর সাথে পরিচয়। রাকিব কুয়ালালামপুর এর একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে লেখাপড়া করে। আকিব এসেছে ভাই এর সাথে ঈদে মালয়েশিয়া বেড়াতে। দুরাত পেনাং কাটিয়ে এসেছে দুদিন আগে, এখন যাচ্ছে লাংকাউই। আমার উল্টো প্ল্যান, লাংকাউই থেকে পেনাং। যাই হোক তিনজনে একটা গ্রাব নিয়ে চলে এলাম কেদাহ এর বিখ্যাত ঈগল স্কয়ারে। আমার হোটেল এখানে বুক করা, ওদের পেন্তাই সেনাং এ। দুপুর তিনটা পর্যন্ত ঈগল স্কয়ার আর মাহা টাওয়ার দেখে ওরা আমাকে আমার হোটেলে নামিয়ে দিয়ে ওদের হোটেলের দিকে রওনা হলো। এদিকে রোযা রেখে দেড়দিনের নির্ঘুম আমি হোটেলে চেকইন করেই গোসল করে নামাজ শেষ করে দেখি ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আসরের ওয়াক্ত বিকেল পৌনে পাঁচটা, তাই জেগে থেকে আসরের নামাজ পড়ে ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটার এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম ঘন্টা দুয়েকের জন্য। আজকের এখানকার ইফতারের সময় সাড়ে সাতটার পর। 

আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর রহমতে ২৭ রমজানের ইফতার করলাম লাংকাউই এর অন্যতম মসজিদ Msjid Al Hana'  তে। আজ দুপুরে এয়ারপোর্ট থেকে যে গ্রাব কার এ করে হোটেলে এলাম, তার মুসলিম ড্রাইভার জানালো এই মসজিদে ইফতার করার কথা। ঘন্টা দুয়েকের ঘুম দিয়ে উঠে তৈরী হয়ে মিনিট দশেক হেঁটে চলে এলাম হোটেল হতে এক কিলোমিটার দূরের এই মসজিদে। সন্ধ্যা ০৭:৩৬ এ ছিলো আজকের ইফতার। আমি মসজিদে ঢুকতে ঢুকতে আজান দিয়ে দিয়েছে। মূল মসজিদ কম্পাউন্ডে পুরুষ এবং মহিলাদের আলাদা নামাজের জায়গার পাশে ক্যান্টিন, কার পার্কিং রয়েছে। আমি ঢুকতেই একটা টেবিলে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে পানির বোতল আর খেজুর দিলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে নামাজ শুরু হয়ে গেল। নামাজ শেষে পেছনের ক্যান্টিনে মূল ইফতারে আজকের আয়োজন ছিলো ভাত, মুরগী ফ্রাই, ডিমের কারি, ডাল, সবজির সালাদ, চাটনি, একটা হালুয়ার বরফি টাইপ মিষ্টান্ন, তরমুজ, মাল্টা, দুই পদের শরবত। মেনুগুলোর সম্ভাব্য মালয়েশিয়ান নামঃ ভাত (Nasi Putih), মুরগির মাংস (Ayam Goreng)ডি, মের কারি (Telur Rebus)মি, কসড সবজির সালাদ (Sayur Campur), আচার (Acar), সবুজ আইটেম (ডেজার্ট টাইপ) (Kuih Seri Muka), আমের জুস (Juice Manga), রুহ আফজা টাইপ জুস (Juice Serup)।

ইফতার শেষে চা খাওয়ার ইচ্ছে জাগলো। আল হিনা মসজিদ হতে বের হয়ে একে ওকে জিজ্ঞাসা করে কোন সদুত্তর পাচ্ছিলাম না। তখন দেখা মিললো এই বাচ্চাকাচ্চাদের, মালয়েশিয়ান টিনেজার এর দল। তাদের জিজ্ঞাসা করতে তাদের মধ্যে ভালো ইংরেজি বুঝে এমন একটা মেয়ে (ছবিতে আমার সাথে সামনে যে) আমার সাথে কথা বলা শুরু করলো। আমরা দুজনের কেউই কিছু বুঝতে পারলাম বলে মনে হয় না। তবে সে খুব কনফিডেন্সের সাথে বললো তার সাথে হাটতে, তারা যে পথে যাচ্ছে, আমার চায়ের দোকানও সেই দিকে। অনেকক্ষণ কথা বলে বুঝলাম সবকয়টি স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাকাচ্চা। শেষে সে আমাকে একটা মেডিসিন এর দোকানে এনে ছেড়ে দিলো!!!! যাই হোক যাওয়ার আগে মেয়েটি মোবাইল বের করলো, আমার সাথে সেলফি তুলবে বলে। তার মোবাইলে ছবি তোলা হলে, আমার মোবাইলেও তুললাম। তাদের বিদায় দিয়ে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করায় সেও একই ঔষধের দোকান দেখিয়ে দিলো। বুঝলাম না ঘটনা কি!!! 

এশার নামাজ শেষে একটা গ্রাব কল করে গেলাম পেন্তাই সেনাং (Pentai Cenang) সৈকতে। ঘড়িতে রাত দশটা পেড়িয়ে গেছে। ঈদ আসন্ন বলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা। স্ট্রিট ফুডের দোকানের মহিলাকে দেখলাম এক কাস্টমারকে বললো আগামীকাল থেকে স্টল বন্ধ থাকবে, ঈদ উৎসব আসন্ন কি না। সেখানে ফ্রাইড রাইস উইথ প্রন এন্ড চিকেন দিয়ে ডিনার সারলাম, সাথে ম্যাংগো ফ্লেভারের জুস, থুক্কু সিরাপ 🙇‍♂️ মাত্র ২০ রিংগিতে খাওয়া শেষ। কিন্তু বাংলা টাকায় ৬৫০ টাকায় এই ফ্রাইড রাইস!!! 🙆‍♂️। এরপর একটা দোকানে আগামীকাল এর সম্ভাব্য ডে ট্রিপ ট্যুর ১০০ রিংগিতে ঠিক করে রওনা হলাম হোটেলের দিকে। গ্রাব ড্রাইভার এর সাথে আলোচনা করে প্ল্যান করলাম ডে ট্রিপ ট্যুর এ না যাওয়ার। রাত বারোটা নাগাদ হোটেলে ফিরে এই লেখা লিখতে লিখতে রাত দুটো বাজে। আগামীকাল একটু আরাম করে ঘুমিয়ে বিকেলের শিফট এ স্কাইব্রিজ দেখতে যাবো। 


মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ