কুয়ালালামপুরে কাটানো প্রথম দিনটি ছিলো জীবনের অন্যতম খারাপ ঈদের দিন

নজরটা লাগছিলো চাঁনরাইতেই। বেশীরভাগ প্ল্যান সেদিন রা থেকেই বদলে যাচ্ছিলো। প্ল্যান ছিলো আগে চা খেয়ে স্যান্ডেল কিনে তারপর সেলুনে যাবো। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পরে ইফতার, এরপর নামাজ শেষে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা। একটু বিশ্রাম নিয়ে ফেসবুকে আপডেট দিতে দিতেই দেখি ঘড়িতে নয়টা পেরিয়ে গেছে। খোঁজ করে আশেপাশে সেলুন না পেয়ে লিটন ইন্ডিয়া চলে গেলাম। সেখানে খোঁজ করতেই একটি সেলুন পেয়ে ঢুকে পড়লাম। অথচ পরে Tea Kadai এ চা খেতে গিয়ে দেখি তার কয়েক দোকান পরেই একটা সেলুন খোলা, কাস্টমার আছে ভালোই। তাই সবার আগে যেখানে চা খাওয়ার কথা৷ সেখানে ডিনার শেষ করে চা খেলাম সবার শেষে। ডিনার খাওয়ার প্ল্যান ছিলো Restoran Tajuddin Hossain এ, কিন্তু আমি সেখানে রাত দশটার পরে গিয়ে দেখি দোকানের চেয়ার টেবিল গুছিয়ে ধোঁয়ামোছার কাজ চলছে। ফলে ফিরে গেলাম সেই Kapita Restorant এই। চুল কাটিয়ে বের হয়ে স্যান্ডেল কিনতে পারি নাই। 

আলহামদুলিল্লাহ ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে পারলাম সকাল ০৮টার জামাতে। ইচ্ছে ছিলো কেলিং কাপিতান মসজিদে (এখানকার সবচেয়ে বড় মসজিদ) ঈদের নামাজ পড়ার। গতকাল একজনকে জিজ্ঞাসা করেছি, স্থানীয় ভাষায় সে ৮ দেখালো, এখন বুঝতে পারছি কার্যক্রম শুরু হবে আটটায় বুঝিয়েছে। আমি সকাল সাড়ে সাতটার দিকে গিয়ে দেখি মসজিদ ফাঁকা। দুজন স্থানীয় লোক মসজিদে প্রবেশ করলে তাদের জিজ্ঞেস করে জানলাম ঈদের জামাত ৯টায়। সাড়ে নয়টায় আমার কুয়ালালামপুর এর বাস... কি করা যায়? তাদের পরামর্শ মতে চুলিয়া রোডের দিকে হাঁটা ধরলাম। পৌনে আটটার দিকে একটা মসজিদে পৌঁছে দেখি জামাত দাঁড়িয়ে গেছে। একটা মোটরসাইকেল আরোহী মুসলিম সেই মসজিদে জামাত মিস করে টানা সোজা রাস্তার সম্মুখে মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে গেল এবং বেশ কিছু দূর গিয়ে এক জায়গায় থামলো, দেখে বুঝলাম কোন মসজিদ আছে সেখানে। এই পেনাং এ ভবনের ভেতর ছোট ছোট অনেকগুলো মসজিদ রয়েছে। এই চুলিয়া রোডেই চার পাঁচটি ছোট ছোট মসজিদ রয়েছে। যাই হোক সকাল আটটার জামাতে নামাজ পড়লাম "আঞ্জুমান হিদায়াতুল ইসলাম" নামক মসজিদে। নামাজ শেষ করে মসজিদের বাইরে বের হলে এক বাংলাদেশী ভাই, রাজু নাম, ঝিনাইদহ বাসা, দেখা হল। উনি যাচ্ছেন কাপিতান মসজিদে নামাজ পড়তে।

হোটেল হতে চেক আউট করে এখন কুয়ালালামপুর এর সাড়ে নয়টার বাস ধরতে গ্রাব কল করে চলে এলাম Prangin Mall এর বাস কাউন্টার এ। কিন্তু "নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে" করে দিয়ে তারা আমাদের যাত্রীদের একটা বাসে আর আমাদের ব্যাগেজ আরেকটা পিকআপ ভ্যান টাইপের গাড়ীতে করে যখন পেনাং বাস টার্মিনালে পৌছাঁলো তখন আবিষ্কার করলাম আমাদের নির্ধারিত বাস Billion Star Express ছেড়ে গেছে ঠিক সাড়ে নয়টাতে, আমাদের তুলে দেয়া হলো অন্য একটা বাসে। এ নিয়ে অনেক নাটক হলো, সেই ঘটনায় না যাই। বেলা সাড়ে দশটায় রওনা দিয়ে দুপুর দুইটার আগে এক পেট্রোল পাম্পে পাঁচ মিনিট এর বিরতি দিলো, হালকা হওয়ার জন্য। আমি হালকা হবো কি? সকাল থেকে তো ভারীই হতে পারলাম না। ঈদের নামাজ পড়ে ছুটেছি বাস ধরতে, ঈদের ছুটির কারণে কোন দোকানপাট খোলা পেলাম না হালকা কোন খাবার কিনে নেয়ার মতো। তো সেই পাম্পের আশেপাশে একটা ফুডভ্যানে পাউরুটি সাজানো থাকলেও দোকানি মেয়েটি বললো দোকান বন্ধ!!! বেলা সাড়ে চারটায় পৌঁছে গেলাম কুয়ালালামপুর এর প্রধান বাস টার্মিনাল TBS এ। এখন হতে গ্রাব কল করতে গেলাম, দেখি পিকআপ পয়েন্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় আর হ্যাপা আছে। তাই সরাসরি LRT লাইনে গিয়ে ৩.১০ রিংগিত দিয়ে একটা বাংলাদেশী ছেলের সহায়তায় (ভাংগতি ১০ পয়সা না থাকায় সে দিয়ে দিলো, ঋণী রইলাম তার কাছে। 

LRT হতে নামলাম Masjid Jamek স্টেশনে, এখান হতে হোটেল ৬০০ মিটার।  স্টেশন থেকে বের হয়েই যে খাবারের দোকান পেলাম, "Restoran Basheer Bistro", সেখানে ঢুকে পড়লাম। জীবনে প্রথম মনে হয় ঈদের দিন দুপুরে ভাত খেলাম। বের হয়ে প্রথম যে খাবার দোকান পড়লো সেটাতেই ঢুকলাম। বিরিয়ানির চেহারা পছন্দ না হওয়ায় ভাত খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাত, বেগুনের তরকারি (শুটকি-বেগুন স্টাইলে), আলু/লাউ এর তরকারি, মুরগীর ভুনা তরকারি দিয়ে ভাত খেলাম। বাঙ্গালী ওয়েটার ছেলেটা একগাদা ভাত দিয়ে দিলো, এতো ভাত শেষ কবে খেয়েছি জানিনা। কোকে চুমুক দিয়ে বিল দিলাম মাত্র ১২.৫০ রিংগিত। আহা, ঈদের দিনের সেমাই, পোলাও, মাংস সব কই গেল!!! অবশ্য ৬দিন পর ভাত খেলাম। খাওয়া আহামরি স্বাদের কিছুই ছিলো না, ক্ষুধার্ত পেটে তাই খেয়ে গেছি।

মিনিট দশেক ধীরেসুস্থে হেঁটে পৌঁছে গেলাম Hotel Nan Yeang এ, যেটা বুক করে দিয়েছে বন্ধু আপন। বিকেল পাঁচটার পরে পৌঁছেও রুম রেড ছিলো না, আধঘন্টা পরে রুম দিলো। রুমে চেকইন করে মন খারাপ হয়ে গেল, এমন পঁচা রুমে ট্যুরে এসে থাকা হয় নাই। ঈদের রাশ এর কারণে ভালো রুম নাকি দিতে পারে নাই, বললো পরের দিন দিতে পারবে। যাই হোক, ফ্রেশ হয়ে বের হলাম হোটেল থেকে। শুরু হলো "সার্চ - দ্যা খোঁজ" সিনেমার; পরদিন গেন্টিং হাইল্যান্ড আর তার পরের দিন মালাকা যাওয়ার ট্যুর প্যাকেজ এর। ছোটাছুটি আর এদিক সেদিক খোঁজ করে জানলাম কোন ট্যুর প্যাকেজ তো পরের কথা, কোন বাসের টিকেটও ফাঁকা নাই। উপায় গ্রাব বা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে যাওয়া। যাওয়া আসায় ৩৫০-৪০০ রিংগিত খরচ হবে, মানে বাংলা টাকায় দশ-বারো হাজার!!! শেষে যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি ৩দিম কুয়ালালামপুরেই থাকবো, তখন একজন বললেন সরাসরি TBS গিয়ে খোঁজ করতে, সেখানে Melaka'র টিকেট পেতে পারি। বিকেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে রওনা হলাম TBS, সফলভাবে একদিন পরের সকাল ০৭:৩০ এর টিকেট পেয়ে গেলাম। এবার হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, পরের দিন কুয়ালালামপুর এক্সপ্লোর এর সাথে Batu Caves এবং Putrajaya Mosque ভ্রমণ এর প্ল্যান রাখলাম। Genting Highland এবার ভাগ্যে নাই, পরবর্তীতে কখনো মালয়েশিয়া আসা হলে Genting Highland এর সাথে Cameron Highland'ও ভ্রমণ করবো না হয়।

ঘড়িতে তখন রাত নয়টা পেরিয়ে গেছে। হোটেলে না গিয়ে চলে গেলাম Petronas Twin Tower দেখতে, LRT ধরে KLCC স্টেশনে। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে, ছবি তুলে রাত দশটার পরে রওনা হলাম হোটেলের দিকে; আর এখানেই ঘটনার শুরু। এক আফগান বংশদ্ভূত পেশওয়ার এর পাকিস্থানি পখতুন বছর ছাব্বিশের যুবা, যে নয় বছর এখানে, দেশে যায় নাই, তার সাথে পরিচয় হলো। আমি এবং সে দুজনেই ভুল করেছি, বিপরীত দিক গামী ট্রেনে উঠে পড়েছি। দুই স্টেশন পরে আমি খেয়াল করলাম আমরা যাবো ১৪ নাম্বার স্টেশনে, কিন্তু ট্রেন ১২ থেকে ১০ চলে আসছে। তাকে বললাম, সে বললো টেনশন নিয়ো না। এরপর আরও দুবার বলার পর, চতুর্থ বারে তার হুঁশ হলো; লোকাল একজনকে জিজ্ঞেস করে যখন সে কনফার্ম হলো ততক্ষণে আমরা স্টেশন ৪ এ চলে আসছি!!!

এরপর দ্রুত লাইন চেঞ্জ করে ট্রেন আসলে উঠে পড়লাম, কিন্তু ট্রেনে থাকা ট্রেনের দুজন কর্মচারী জানালো, ট্রেন যাবে না, সার্ভিস বন্ধ হয়েছে। ঈদের কারণেই কি না কে জানে, সেদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই ট্রেন বন্ধ হলো। কি করা যায়, স্টেশন থেকে বের হয়ে দেখি আমাদের মতো আরও এক পাকিস্তানের পেশওয়ারি এবং ফিলিপাইন এর দুজন পর্যটক এই ভোগান্তিতে পড়েছে। গ্রাব কল করে পাকিস্তানি'কে নিয়ে যখন চায়না টাউন পৌঁছেছি, ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটার বেশী, দুজনের সব মিলিয়ে ৪০ রিংগিতের বেশী খরচ হয়ে গেছে। অথচ দুই স্টপেজ, ৩ রিংগিত ভাড়া আর মিনিট দশেকের যাত্রা ছিলো। 

যাক ২৪ ঘন্টার ঝামেলাপূর্ণ একটা দিন কাটলো। রাতের খাবার খেতে চায়না টাউনের বাইরে খোলা পেলাম একটা দক্ষিণ ভারতীয় মুসলিম রেস্টুরেন্ট। গরুর বট এর দেখা পেলাম, ওভেনে গরম করে দিলো; মোটামুটি ভালোই ছিলো। তবে ঠান্ডা স্টিকি স্টিকি ভাতের কারণে খেয়ে মজা পেলাম না; আর সাথে পেলাম শেষ হয়ে যাওয়া তলানিতে থাকা এট্টুখানি ঘন ডাল।জীবনে প্রথম ঈদের দিন দুবেলা ভাত খেতে হলো। আর এভাবেই ভ্রমণ এবং ঈদের সময়ে বিশ্রী একটা দিন কাটিয়ে রাত বারোটার পর হোটেলে পৌঁছলাম। 


মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ