চলে এলাম পেনাং এর জর্জটাউন (মালয়েশিয়া ভ্রমণ - দিন ০৩)

গতকাল রাত ৩টার দিকে ঘুমাতে গেছি, সারাদিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি, স্কাইব্রিজে হাঁটাহাঁটির ধকল... তবুও মাত্র ৫ ঘন্টা ঘুমানোর পর সকাল আটটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। এদিন আর কিছু করার প্ল্যান ছিলো না। ভেবেছিলাম আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড একুরিয়াম দেখবো সকালে। কিন্তু সেটা শুরু হবে ১০টার পর। ১২/১৪ কিলোমিটার পথ গ্রাব ভাড়া করে যাওয়া এবং ফিরে এসে হোটেল হতে লাগেজ নিয়ে ফের এয়ারপোর্টে যাওয়া... পোষাবে না বলে বাদ দিলাম। সেখানে যদি লাগেজ রাখার জায়গা থাকতো, তাহলে হোটেল হতে একেবারে বিদায় নিয়ে সেখানে গিয়ে লাগেজ রেখে একুরিয়াম ঘুরে দেখে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে যেতাম। আসলে লাংকাউই ভ্রমণে এমনিতে সবাই একদিন কিলিম জিওফরেস্ট উইথ ফোর আইল্যান্ড ট্রিপ করে, আর অন্যদিন করে স্কাই ব্রিজ। আমি আগের দিন সকালে কিলিম জিওফরেস্ট আর দুপুর থেকে বিকেলে স্কাই ব্রিজ শেষ করে ফেলেছি বলে আজকে আর কিছু করার ছিলো না। 

লাংকাউই অধ্যায় আজ শেষ, চমৎকার এই শহরটি বারবার ভ্রমণ করার মতো। সুযোগ পেলে এক সপ্তাহের রিলাক্স ট্যুর করতে চাই এই অপরূপ সুন্দর দ্বীপ শহরটিতে। বিকেল সাড়ে চারটায় ফ্লাইট, লাংকাউই থেকে পেনাং এর। তাই হোটেল হতে চেক আউট করে ব্যাগ রিসিপশনে জমা রেখে ঈগল স্কয়ার এর চক্ষু শীতল করা পরিবেশে ঘন্টা দুয়েক সময় কাটাতে হোটেল হতে বের হয়ে হাঁটা শুরু করতে দেখি প্রচন্ড গরম, যদিও গুগল দেখাচ্ছে ৩২ ডিগ্রি। ২ কিলোমিটার এই রোদে হাটাহাটি না করে গ্রাব কল করে চলে আসলাম। সমুদ্র তীরবর্তী ওয়াকওয়ের ধারে একটা গাছের ছায়াযুক্ত স্থান খুঁজে নিয়ে বসেছিলাম দুপুর দেড়টা পর্যন্ত, সামনে বাম দিকে জেটি ঘাট, ডানদিকে মাহাটাওয়ার আর সম্মুখে নীলজলের মাঝে জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের দল আর তার বাঁকে বাঁকে চলাচল করা স্পিডবোট, ফেরি, দাঁড়িয়ে থাকা ক্রুজশিপ, ইয়াচ এর সারি। বেলা দেড়টার দিকে গ্রাবে গাড়ি কল করলাম এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিতে।

একটা শহরকে দু'দিন সময়ে এতটা ভালো লেগে যাবে, ভাবতেই অবাক লাগছে। শুরুটা হয়েছিলো জঘন্য; কুয়ালালামপুর থেকে ফ্লাইট মিস করে পরবর্তী ফ্লাইটের টিকেট কেটে লাংকাউই এর মাটিতে পা রেখে ছোট্ট এয়ারপোর্টটিই ভালো লেগে গিয়েছিল।  বিকাল ৪:৪০ মিনিটে পেনাং এর ফ্লাইট, ফায়ারফ্লাই এয়ারলাইন্স এ। তো লাংকাউই পৌঁছে প্রথম যে গ্রাব কল করি তার চালক আব্দুল্লাহ বিন মানসুর যাত্রা শুরুতেই আমার উপর রেগে আগুন। ব্যাক ডিকিতে আমার লাগেজ রেকে ডিকি বন্ধ করার সময় একটু জোরে ধাক্কা লাগতে বেশ জোরে শব্দ করেই বন্ধ হলো। আর যায় কোথায় মিনিট দশেক সে রাগে ফুটতে লাগলো, আর অনবরত কথা শোনাল। পরে জানলাম সে একটু রাগী মানুষ, মালয়েশিয়ার স্বেচ্ছাসেবক সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলো। ঘটনা হলো আজ ঈগল স্কয়ার থেকে গ্রাব কল করলাম মাল্টি ডেস্টিনেশন দিয়ে, হোটেল লবি হতে লাগেজ নিয়ে তারপর এয়ারপোর্টে যাবো। উবারে দেখি মেরুন কালারের নির্দিষ্ট নাম্বারের গাড়ী, দরজা খুলতে দেখি ব্যাটা আব্দুল্লাহ বিন মানসুর। কি কাকতালীয় ব্যাপার, ওর গাড়ি করে এয়ারপোর্ট থেকে লাংকাউই শহরে গেলাম, ফের তার গাড়িতেই ফিরে যাচ্ছি। অনেক কথা হলো এবার, এয়ারপোর্টে পৌঁছে তার সাথে একটা রানিং এর উপর সেলফি তুলে নিলাম গাড়ি হতে নেমে। 

গত তিনদিন দুইরাতে দেখা চমৎকার শহর লাংকাউই। হাসিখুশী মিশুক প্রকৃতির লোকজন। নির্ভয়ে রাত বারোটায় গ্রাব করে ১৫/২০ কিলোমিটার যাতায়াত করেছি, রাতে ফাঁকা রাস্তায় হেটেছি, লোকাল মসজিদে ইফতার করেছি। রাস্তাঘাট, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, রাস্তায় শৃঙ্খলা সব মন কেড়েছে। সময় সুযোগ পেলে আবার আসতে চাই এই শহরে, আরও বেশি সময় হাতে নিয়ে। 

এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোর্ডিং পাস মেশিনে আমার টিকেট এর কোড দিলে বারবার এরর দেখাচ্ছিলো। ভয় পেলাম, আবার টিকিট এর ঝামেলা!!!  শেষে বোর্ডিং কাউন্টার এ গেলে সুন্দর টিকিট চেক করে বোর্ডিং পাস দিয়ে দিলো সাথে সাথে। ঘটনা হলো ফ্লাইট ছিলো ফায়ারফ্লাই এয়ারলাইন্স এর, কিন্তু অনলাইনে টিকিট বিক্রি করেছে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স! 🙇‍♂️ এইটা কিছু হইলো? তাই মেশিন ব্যাটা এরর দেখাচ্ছিলো। যাই হোক তখন ঘড়িতে দুপুর তিনটা প্রায় বাজে। ডিপারচার গেটের কাছে থাকা নামাজের জায়গায় অযু করে নামাজ পড়ে নিলাম। এরপর দীর্ঘ দুই ঘন্টা অপেক্ষা করে বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে উড়াল দিয়ে বিশ মিনিটে পেনাং পৌঁছে গেল। প্লেনে উঠে মন ভালো হয়ে গিয়েছিলো, জানালার পাশে সিট সাথে আমার পাশের পুরো সারিতে কোন যাত্রী নেই... কিন্তু এহেন সুখ সহে কেমনে? তাই বিশ মিনিটে খেলা শেষ... প্লেনে উঠার সময় কুকিজ, সল্টেড নাট আর ছোট্ট পানির বোতল দিলো গেটে, সময় কম বলেই এহেন ব্যবস্থা... পরে বুঝতে পারলাম।

যে দেশে যে নিয়ম। পেনাং পৌঁছে গেলাম আধঘন্টার উড়ানে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হাতের বাম পাশে বাস কাউন্টার। 401E বাসটি মিনিট দশেকের মধ্যে চলে আসলো। এখানে সিস্টেম ভাড়ার সমান ভাংতি টাকা নিয়ে বাসে উঠতে হবে, দাণ বাক্সর মতো বক্সের ভেতর টাকা দিলে ড্রাইভার মেশিন প্রিন্টেড টিকেট দিবে। আমার কাছে ভাংতি না থাকায় ২ রিংগিত এর ভাড়া দিলাম ১০ রিংগিত!!! 🙆‍♂️🙇‍♂️

বাসে উঠে একটা বাংলাদেশী ছেলের সাথে পরিচয় হলো। ১৫ বছর বয়সে দালাল ধরে বয়স বাড়িয়ে সাড়ে চারলাখ টাকা খরচ করে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়া এসেছে, বিগত প্রায় ১০ বছরে দেশে যায় নাই। নরসিংদী'র ছেলে, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ এবং একমাত্র ভাই। দেশে জমি কিনেছে, নিজেদের জমিতে পাঁচতলা বাড়ি তুলেছে। এখন দালাল ধরেছে ইতালি যাওয়ার জন্য। ১৬ লাখ টাকার মধ্যে ৬ লাখ পেমেন্ট করেছে, বাকী ১০ লাখ দিবে ইতালি যাওয়ার পরে; অবশ্যই বৈধ ভিসায়। এখানেও আছে বৈধ ভিসায়। প্রতি বছর প্রায় দুমাসের বেতনের কাছাকাছি টাকা দিয়ে ভিসা রিনিউ করে। এতো গল্পের মাঝে বারংবার তার সন্তুষ্ট ঝরে পড়ছিল। দুই স্টেশন পরে নেমে গেল সে... ছেলেটির নাম নাঈমুল ইসলাম, বয়স ২৫ বছর মাত্র। একটি ছবি তুলে স্মৃতিতে রাখলাম। এদের ত্যাগের বিনিময়েই ঘুরে দেশের রেমিট্যান্স এর চাকা। ভালো কথা, সেও এখানে অটোমোবাইল কোম্পানিতে কাজ করে। 

রাস্তায় ভীষণ জ্যাম। পেনাং মূলত শিল্প শহর বলে মনে হল। Penang মালয়েশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এটি দুটি অংশে বিভক্ত—Penang IslandSeberang Perai, যা Penang BridgeSultan Abdul Halim Muadzam Shah Bridge দ্বারা সংযুক্ত। Penang-কে “Silicon Valley of the East” বলা হয়, কারণ এখানে Intel, AMD, Bosch-এর মতো কোম্পানির কারখানা রয়েছে। Bayan Lepas Free Industrial Zone শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিখ্যাত। এছাড়া Penang Port বাণিজ্যের কেন্দ্র। বহুজাতিক সংস্কৃতি, উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে Penang অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

আমি সাতটার পরে নামলাম কুইন্সবে মল নামক স্টপেযে, এয়ারপোর্টে একজনের দেয়া তথ্য মতে। কিন্তু মজার ব্যাপার সেখান থেকে জর্জটাউন প্রায় ১২/১৫ কিলোমিটার দূরে। শেষে গ্রাব কল করে বাড়তি টাকা মাশুল দিয়ে ঠিক ইফতার এর আগ মুহূর্তে পৌঁছে গেলাম জর্জটাউন এর বিশপ রোডের "হোটেল বিশপ" এ যা আগে থেকেই Agoda থেকে বুকিং করে রেখেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ। ইফতারের আজানের সময় হোটেলে পৌঁছে প্লেনে দেয়া কুকিজ, সল্টেড নাট আর পানির বোতল সাথেই ছিলো; তা দিয়ে ইফতার করে হোটেলের রুমে ব্যাগ রেখে স্থানীয় নামাজ ঘর সারুহ'তে মাগরিব এর নামাজ পড়ে Kapitan Restaurant এ গার্লিক নান, তান্দুরি চিকেন, গ্রিন আপেল ফ্রেশ জুস দিয়ে ইফতার করতে করতে এশার আজান দিয়ে দিলো। এখানে পরিচয় হলো বাগেরহাটের এক কর্মচারীর সাথে, আট বছর হলো মালয়েশিয়া আছে; সেই আমার অর্ডার নিয়েছিলো। 

খাওয়া শেষ করে মসজিদে যেতে যেতে জামাত শেষ। বিখ্যাত Kapitn Keling মসজিদে কসর এর নামাজ পড়লাম একা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামাজের ধরনের ভিন্নতা নিয়ে গল্প শুনেছিলাম ছোট ভাই রনি'র কাছে। মালয়েশিয়া এসে এখানের তারাবিহ নামাজের কিছু ব্যতিক্রমী ব্যাপার চোখে পড়লো। নামাজ শেষে খোঁজ করে জানলাম আগামীকাল দুপুর দেড়টায় জুম্মার জামাত আর পরশু সকাল ০৮:০০টায় ঈদুল ফিতরের জামাত। ইনশাআল্লাহ ঈদের নামাজ পড়ে নাস্তা করে রওনা দিবো কুয়ালালামপুর এর উদ্দেশ্যে। নামাজ শেষ করে রাতের জর্জটাউন এ হেঁটে বেড়ালাম। চিউ জেটিতে গিয়ে বেশ কিছু চাইনিজ রেস্টুরেন্টে লাইভ মিউজিক হচ্ছে দেখলাম; তবে বেশীরভাগ রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। সেখান হতে গেলাম আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে, স্ট্রিট ফুডের বিখ্যাত দোকানগুলো বন্ধ। রাত এগারোটার দিকে Kapitan Restaurant থেকে সাদাভাত আর গরুর মাংসের কালাভুনা টাইপের মিষ্টি স্বাদের তরকারি নিলাম ৭ রিংগিতে সাথে ৫.২০ রিংগিত এর এলমন্ডস মিল্ক। এরপর হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরে এলাম। এই হাঁটাহাঁটির মাঝে রাতের আলোতে বেশকিছু স্ট্রিট আর্ট, হেরিটেজ রিকশা, আমব্রেলা লাইটিং স্ট্রিট দেখে ফেললাম, ছবি তুললাম। 

হোটেল এ ফিরে রুমে গিয়ে দেখি চার্জার পয়েন্ট মিলে না। রুম দোতলায়, রিসিপশন একতলায়। রুম হতে সার্ভিসের কাউকে খোঁজ করতে উঁকি মারার ফাঁকে গেট বন্ধ হয়ে লক হয়ে গেল, কার্ড ভেতর এ... 🙆‍♂️🙇‍♂️। খালি পায়ে একতলায় গিয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় ম্যানেজারকে খুঁজে বের করে তাদের কাছে থাকা ইমার্জেন্সি লক কি দিয়ে রুম খোলা হলো, চার্জার পয়েন্ট এর সমাধান করে দিলো। দু বোতল পানি ছিলো রুমে, তাকে অনুরোধ করলাম আরও দুই বোতল পানি দিতে। দুরাত আগের পানিশূন্যতায় কাফ মাসল ক্রাম্প এর যন্ত্রণার কথা মাথায় আছে। 

এরপর একটা হট শাওয়ার নিয়ে ডিনার কাম সেহেরি সেরে নিলাম Kapitan Restaurant থেকে পার্সেল করে আনা সাদাভাত আর গরুর মাংসের তরকারি দিয়ে। খাওয়া শেষে এলমন্ডস মিল্ক। খাওয়া দাওয়া শেষে এই পোস্ট লিখতে লিখতে ঘড়িতে রাত দেড়টা পেড়িয়ে গেছে। আগামীকাল সারাদিন ব্যস্ততায় কাটাবো। আজকের দিনটা ফাও গেলো, সেটা আগামীকাল পুষিয়ে দিতে হবে...

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ