ফি ফি

ফিফে আইল্যান্ডে এতো সুন্দর ভিউ এর হোটেল রুমের লাগোয়া বারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে আইয়ুব বাচ্চুর প্রিয় সব গানে বুঁদ হয়ে শিস দিয়ে সুর তুলবো "চলো বদলে যাই..."। কিন্তু না, ট্যুরে এলে আমার সব দেখতে চাই, আরও বেশী ঘুরতে চাই অভ্যাসটার কারণে আয়েশ করে হোটেল রুমে শুয়ে বসে আরাম করে কাটানো আর হয় না। আজ ফিফি থেকে চলে যাবো ক্রাবি। গতকাল ফুকেট থেকে ফিফি এসে জেটিঘাট থেকেই পরের দিন সকাল ০৯:০০টা থেকে চার ঘন্টার প্যাকেজ ট্যুরে লং টেইল বোটে ফোর আইল্যান্ড ট্রিপ যার অন্যতম "The Maya Bay" খ্যাত সাদা বালির মায়া দ্বীপের সমুদ্র সৈকত দেখা। ঠিক ১টার মধ্যে জেটিতে ফিরে দেড়টার ফেরিতে করে রওনা হবো ক্রাবির উদ্দেশ্যে। 

সকালবেলা এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, ঘুম থেকে জেগে চলে গেলাম Loh Dalum সৈকতে, চ্যাটার্জি'র পরামর্শ মেনে। সূর্যদয়ের কোন ভিউ না পেলেও ফাঁকা সৈকত পেলাম। সেখান থেকে ফিফি হোটেলে ফিরে বুফে ব্রেকফাস্ট করলাম। পুরাতন এবং জনপ্রিয় হোটেলটি একটু খরুচে হলেও (বাংলা টাকায় সাত হাজারের উপরে ভাড়া, ফিফি হলো রাজ্যের ইউরোপ আমেরিকার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এবং এই সময় থাকে রাশ সিজন। সেই বিবেচনায় ভাড়া খুব বেশী না), এর আবেদন, ব্যবস্থাপনা সবকিছু ছিলো টপনচ। নাস্তা শেষে রুমে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে চেক আউট করে সোজা চলে গেলাম জেটি ঘাটে যে এজেন্সির কাছ থেকে টিকেট কেটেছি তাদের কাছে। গতকালই কথা হয়েছিলো লাগেজ তাদের দোকানে রেখে ফোর আইল্যান্ড ট্রিপে যাবো। তাদের দোকানে ব্যাগ রেখে মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর একজন বছর ত্রিশের ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, সে হচ্ছে আমাদের বোটের চালক। জেটি ঘাটের একপাশে অপেক্ষায় থাকা জনা দশেক সাদা চামড়ার পর্যটকদের মাঝে নিয়ে এলো। সবাই একটু বাঁকা চোখে দেখছিলো, ফুলপ্যান্ট পোলো টিশার্ট পরে যাচ্ছে ফোর আইল্যান্ড বোট ট্রিপে। বোট পাড়ে ভেড়ালে বুঝলাম জুতা খুলে রাখতে হবে, কারণ জলে নেমে বোটে উঠতে হবে। দ্রুত সেই এজেন্টের দোকানে গিয়ে জুতা খুলে রেখে এলাম। যাত্রী বেশী হওয়ায় আরেকটা বোট পাশে ছিলো, আমার, সেই সাদা চামড়াদের মধ্যে একটা ল্যাটিন কাপল, আমি আর সিঙ্গেল বছর ত্রিশের একটা ছেলে, চার সদস্যের এক জাপানি পরিবার এই বোটে। লং টেইল বোট দুটিতে আটজন করে যাত্রী নিয়েছে দুই সারির দুইপাশে বসার জন্য। যদিও আসন আরও বেশি ছিলো। 

ঠিক নয়টা পাঁচে আন্দামান সাগরের নীল জলে সফেদ ফেনা তুলে রওনা হলাম প্রথম গন্তব্য Monkey Beach। মিনিট পনেরো বোট চলার পরে পাথুরে পাহাড়ের নীচে স্বল্প বালুকাবেলায় বোট থামার আগেই অন্য কয়েকটি বোট তীরে ভিড়ে ছিলো, সেই বোটের পর্যটকেরা খর্বাকৃতির তিন চারটি বানরকে ঘিরে দূর থেকে ছবি তুলছে। এরা কিভাবে এই জায়গায় আটকা পড়েছে সেটা একটা গবেষণার বিষয়। আর সেটার জন্য চ্যাটার্জি তো সর্বদাই প্রস্তুত। তো উনি কি জানালেন আসুন দেখা যাকঃ "ফিফি আইল্যান্ডের মানকি বিচের বানরগুলো নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত থাকলেও অধিকাংশ গবেষক মনে করেন এগুলো স্থানীয়ভাবে বসবাসকারী লং-টেইলড মাকাক প্রজাতির স্বাভাবিক আবাসস্থলের অংশ। দ্বীপটি মূলত বনাঞ্চল ও চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা, যা এই প্রজাতির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। সময়ের সাথে পর্যটকদের আগমন বাড়ায় বানরগুলো মানুষের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বিচ এলাকায় নিয়মিত দেখা যায়। পরিকল্পিতভাবে তাদের এনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং খাদ্যের সহজলভ্যতা ও মানুষের আচরণই তাদের এই নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি আকৃষ্ট করেছে"।

মিনিট দশেক এর মধ্যে বোট রওনা হলো পরবর্তী গন্তব্য পাহাড়ের নীচে একটা কেইভ এর মতো, নামটা মনে নেই এবং কোথাও নোটও নেয়া নাই। সেখানে বোটে থামানো হলেও ভেড়ানো হলো মিনিট দু'তিন পরে রওনা হলো "Pileh Lagoon"। পিলেহ লেগুন থাইল্যান্ডের ফি ফি লেহ দ্বীপে অবস্থিত এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক উপসাগর, যা চারপাশে উঁচু চুনাপাথরের পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। এর স্বচ্ছ পানির রঙ কখনো পান্না সবুজ, কখনো নীলাভ—যা সূর্যের আলোতে দারুণ দৃশ্য তৈরি করে। এখানে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত, তাই সাঁতার ও নৌকাভ্রমণের জন্য আদর্শ। লংটেইল বোটে ভেসে লেগুনের ভিতরে প্রবেশ করা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্জন পরিবেশ একে ফি ফি দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট হিসেবে পরিচিত করেছে। এখানে বোটের প্রায় সবাই স্নোরকেলিং করলো আমি আর দু'একজন ছাড়া; জাপানি পরিবারের বয়স্ক ভদ্রমহিলা আর ল্যাটিন দম্পতির মহিলাটি।

আমি বোটে বসেছিলাম একেবারে সম্মুখপাণে। যদিও বোটের লং-টেইল সামনের দৃশ্যমান অংশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিলো। এবার সেখানে ল্যাটিন সেই কাপলের পুরুষটিও এসে বসলো। আর আমার সাথে সামনের সারি'তে সেই সিঙ্গেল ছেলেটি ফটোস্টিক নিয়ে সারাক্ষণ চমৎকার সব ছবি আর ভিডিও করছিলো। পেটানো শরীরের ছেলেটিকে দেখে ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো'র Much মনে হচ্ছিলো। 

যাই হোক এর পরের গন্তব্য বিখ্যাত "দ্যা মায়া বে"। সাদা বালি আর স্ফটিক স্বচ্ছ জলের এই সৈকতের জন্য আলাদাভাবে ৪০০ বাথ করে সবাইকে পে করতে হলো। এই সৈকতকে ঘিরে আয়োজন চোখে পড়ার মতো। ঠিক বিপরীত দিকে নামানো হলো আমাদের ভাসমান জেটিতে। ঘড়ি ধরে পঞ্চাশ মিনিট সময় দেয়া হলো। সবার হাতে ট্রাভেল এজেন্সির রিচব্যান্ড ছিল। মানুষ আর মানুষ, প্রায় ৪০/৫০টি বোট একসাথে এসে ভিড়ে আছে, একটা ফিরে গেলে তার মাঝে আরেকটি চলে আসছে। গতকাল ভিউ পয়েন্ট এ সূর্যাস্ত দেখে ফেরার সময় একটা ট্রাভেল এজেন্সি দেখেছি, যারা বড় করে লিখে রেখেছে "আমরাই ফিফি হতে সবার আগে প্রথম বোট ছাড়ি"; সময় সকাল সাড়ে ছয়টায়। আগে খোঁজ পেলে সেখান থেকেই বুক করতাম প্যাকেজ। 

চমৎকার সময় কাটালাম মায়া বে'তে। শুভ্রসফেদ বালি আর স্ফটিক স্বচ্ছ নীল জলের "Maya Beach" এ জীব বৈচিত্র্য রক্ষা প্রকল্পে, বিশেষ করে বেবী শার্ক সুরক্ষায়, পর্যটকদের জলে নামা নিষেধ। ৪৫০ রিংগিত শেয়ারড বোট ভাড়া দিয়ে একঘন্টার সমুদ্রপথ মাড়িয়ে ৪০০ রিংগিত এর টিকেট কেটে এর রূপসুধা পাণ করবেন শুধু, নো জলকেলি। বীচ থেকে এবং পরবর্তীতে ঘুরে গিয়ে সমদ্র থেকে সৈকত, দুটি রূপই দেখতে পারবেন। নানান দেশীয় হাজারো পর্যটকদের জলে নামা থেকে বিরত রাখতে দায়িত্বে থাকা গার্ডদের হ্যান্ড মাইকে সারাক্ষণ সতর্ক বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। এক মহিলা পর্যটক জলের মাঝে বেবি শার্ক দেখে ভয় পেলে এক গার্ড সুন্দর বললো, "এদের থেকে ভয় নাই, ভয় আছে মানুষের কাছ থেকে"।

এখান থেকে বোট ছেড়ে নেয়া হলে মায়া বিচ এর ফ্রন্ট ভিউ দেখা এবং ছবি তোলার জন্য ঠিক বিপরীতে। ধীরে একপাক ঘুরে এবার চললো সুইমিং এর জন্য নির্ধারিত আরেকটা গন্তব্যে। সেখানে মিনিট পনেরো সময় দিলো সাতার কাটার। সাতার না জানা আমি ছাড়া বাকী সবাই জলে নেমে পড়লো, সেই বৃদ্ধা সহ। শেষে বোটম্যান আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, " Are you ok sir?" 🤣🤣🤣

দুপুর একটার আগে আগে আমাদের নিয়ে ফেরত আসলো জেটিতে। এরপরে দ্রুত ঘাটের কাছে থাকা 7/11 থেকে দুপুরে খাওয়ার জন্য চিকেন চাউমিন আর জুস কিনে নিলাম। এরপর বোটে উঠে বাম পাশের একটা ডাবল সিটে আয়েশ করে বসে পড়লাম। ফুকেট টু ফিফি'র মতোই এই যাত্রায়ও পুরো পথ দুই সিটে আয়েশ করে চললাম ক্রাবি'র পথে। এই রুটে থাইল্যান্ড এর ভূপ্রকৃতি ধরা পড়লো। জলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা অজস্র ছোট ছোট পাহাড়ের সারি। শেষের দিকে দেখা মিললো ম্যানগ্রোভ বনের, ক্রাবি জেটির কাছাকাছি এলাকায়। দুপুর সাড়ে তিনটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ক্রাবি ফেরিঘাট, Klong Jilad Pie।  ক্রাবি'র Ao Nang জেটিতে আলাদা ফেরি চলাচল করে থাকে। গ্রাব কল করে 

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ