বাটু কেইভ, পুত্রাজায়া মসজিদ এবং অন্যান্য (মালয়েশিয়া ভ্রমণ - দিন ০৬)

ট্যুরে বের হলে একটা না একটা ঝামেলা হয়েই থাকে সবসময়। তাই এই ঝামেলার সময় মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। গতকাল রাত বারোটার সময় হোটেলে ফিরে একটা হট শাওয়ার নিলাম। যেহেতু মালাকার টিকেট পেয়েছি, তাই শুধু আগামীকালের গেন্টিং হাইল্যান্ড ট্রিপ অসম্পূর্ণ রইবে। আগামীতে ফের কুয়ালালামপুর আসা হলে গেন্টিং আর ক্যামেরন এর সাথে হিপহপ বাসে করে কুয়ালালামপুর শহর পরিভ্রমণও করে নিবো। এখন আগামীকাল এর প্ল্যান সাজালাম এরকমঃ ঘুম থেকে দশটা নাগাদ উঠে (ঘুমাতে গিয়েছি রাত দুইটার পরে, ব্লগে লেখালেখি শেষ করে) নাস্তা করে প্রথমে যাবো বাটু কেইভ দেখতে, সেখান থেকে ব্যাক করে যাবো পুত্রাজায়ার বিখ্যাত পিংক মসজিদে। বিকেলের শেষভাগে ব্যাক করে কেএলসিসি পার্ক, মাসজিদ নাগেরা, জালান আলোর আর শেষে চায়না টাউন এর নাইট মার্কেট এলাকায় ঢুঁ মারবো ভালোভাবে, যদিও আছি সেখানেই, আসা যাওয়ার পথে যতটুকু দেখা যায় আর কি ততটুকু দেখা। তাই অফিসিয়ালি দেখার প্ল্যান করলাম। 

সকাল আটটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল, কিছুক্ষণ অলস সময় কাটিয়ে তৈরী হয়ে নয়টার মধ্য হোটে হতে বের হয়ে চায়না টাউন থেকে মাসজিদ জামেক যাওয়ার পথে মেইন রোডে "আল বাইক" নামের রেস্টুরেন্টে পরাটা, মুরগির মাংসের ঝাল কারি আর মগভর্তি চা দিয়ে আয়েশ করে নাস্তা করলাম। এরপর একটা বাংগালী দোকানের এলাকার মাঝ দিয়ে একটু ঘুরা পথে গেলাম মাসজিদ জামেক স্টেশন। এই স্টেশনটি Sultan Abdul Samad Jamek Mosque এর নিকটে অবস্থিত। 

সুলতান আবদুল সামাদ জেমক মসজিদ (Masjid Jamek Sultan Abdul Samad) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ। ১৯০৯ সালে স্থাপিত এই মসজিদটি ক্ল্যাং এবং গম্বাক নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। ব্রিটিশ স্থপতি আর্থার বেনিনস হাবব্যাক দ্বারা ডিজাইনকৃত এই স্থাপত্যটি মোগল, Moorish এবং উত্তর ভারতীয় ইসলামী শৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এটি স্থানীয়ভাবে ‘শুক্রবার মসজিদ’ নামে পরিচিত। মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ এবং দুটি বড় মিনার রয়েছে, যা রক্ত-সাদা ব্যান্ড প্যাটার্নে সজ্জিত। ১৯৬৫ সালে ন্যাশনাল মস্ক নির্মিত হওয়ার আগে এটি কুয়ালালামপুরের প্রধান মসজিদ ছিল। বর্তমানে এটি কুয়ালালামপুরের একটি অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

মিনিট পনেরো সময় কাটিয়ে ঢুকে পড়লাম স্টেশনে এবং এমআরটি লাইন ধরে চলে গেলাম কেএল সেন্ট্রাল স্টেশন। সেখান থেকে বাটু কেইভ যাওয়ার এলআরটি লাইন আছে, তাতে চেপে বসার আগে প্রায় পৌনে একঘন্টা অপেক্ষায় ছিলাম প্ল্যাটফর্মে। দুপুর ঠিক একটা বাজে বাটু কেইভে পৌঁছে ঘন্টা খানেক সময় ঘুরে দেখলাম, মাথার উপর প্রখর তেজের সূর্যমামা'কে সাথে নিয়ে। ঘন্টাখানেক সময়ে আশপাশে ঘুরে দেখে ফের ব্যাক করলাম কেএল সেন্ট্রাল এ। আড়াইটার পরে ধরলাম পুত্রজায়া যাওয়ার ট্রেন, বিকেলের শুরুতে চারটার দিকে পুত্রা সেন্ট্রাল পৌঁছে গেলাম; মাঝে তুন রাজাক এক্সচেঞ্জ এ নেমে ট্রেন চেঞ্জ করতে হয়েছে। গতকাল রাতের ঘটনা মাথায় ছিলো, তাই একটু খোঁজ খবর করে এক বাংলাদেশী ভাইয়ের পরামর্শে ঠিকঠাক ট্রেন চেঞ্জ করতে পেরেছি... হা হা হা। পুত্রা সেন্ট্রাল থেকে গ্রাব কল করে চলে গেলাম পুত্রা পিংক মসজিদে। যেহেতু লাঞ্চ করা হয় নাই, তাই পুত্রা মসজিদ কমপ্লেক্স এর নীচের ফুড লাউঞ্চে দুপুরের খাবার খেলাম পোলাও আর খাসির মাংসের সাথে আলু দিয়ে পাতলা ঝোল, সাথে সালাদ; অবশেষে ঈদের পরদিন দুপুরে কপালে ঈদের জুটলো। রেস্টুরেন্টের নামটা খটরমটর: "Restoran Kari Kepala Ikan Kampung Pendan" 🤔।

খাওয়া শেষে মসজিদের পেছনে থাকা ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে বেড়ালাম কিছুক্ষণ, মূল কম্পাউন্ডের আশেপাশে প্রচুর মানুষের ভীড়, ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা টুরিস্টদের ভীড়। এখানেও প্রচুর বাংলাদেশীদের দেখতে পেলাম। মালয়েশিয়া'তে যে কোন বাংলাদেশীর সাথে পরিচিত হলেই ধরে নেয় মালয়েশিয়াতে আসছি চাকুরী করতে, প্রথম প্রশ্ন "কতদিন হইলো আসছেন? কোথায় জব করেন?"। শেষে আর কথা বলার ইচ্ছে হয় না, অন্য কোন কারণে নয়। তাদের সকলের প্রায় একই ধরনের স্ট্রাগল এর গল্প, অল্প কয়টা বেতনের জন্য দেশ আপনজন ছেড়ে এই পরদেশে পড়ে থাকা। মালয়েশিয়া'তে এখন বেশীরভাগ শ্রমিকদের আসল বেতন ১৭০০ রিংগিত, নরমা ৮ ঘন্টা সপ্তাহে ৬ দিনের জন্য মাসিক বেতন। প্রায় সবাই ওভার টাইম এর উপর নির্ভরশীল। ওভারটাইম করে ৩০০০ রিংগিতের বেশী আয় করে। মূল বেতন ৫০/৬০ হাজার বাংলাদেশী টাকার কাছাকাছি আর ওভারটাইম সহ লাখখানেক হাতে পায় হয়তো। কথা বলে জানলাম থাকা খাওয়া আর আনুষাঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলে মাসে নুন্যতম ১০০০ রিংগিত চলে যায়। বাকী টাকা থেকে ধার/লোন পরিশোধ, দেশে পরিবারকে খরচের জন্য টাকা পাঠানো আর তার পরে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়। সেই সঞ্চয় নিয়ে আবার আপনজনদের সাথে নানান অপ্রিয় গল্প। আমার মনে হলো সবচেয়ে অভাগা এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী শ্রমিকেরা। 

এরপর মূল মসজিদ কমপ্লেক্স এ ঢুকে অযু করে নামাজ পড়ে ফেরার যাত্রা শুরু করলাম। সন্ধ্যার বেশ কিছু আগে পুত্রাজায়া থেকে কেএল সেন্ট্রাল হয়ে এসে পৌঁছলাম বুকিত বিনতাং, গন্তব্য বিখ্যাত "Pavilion Mall" ঢুঁ মারা, এক বড়লোক বুন্ধুর পরামর্শ এবং মাস্ট ডু থিং ইন কুয়ালালামপুর। 🤣 ঈদ উপলক্ষে সাজসজ্জায় জাকজমক একটু বেশীই ছিলো, ভীড়ও মাশা'আল্লাহ সেইরকমই। সন্ধ্যার পরে এখান হতে চলে গেলাম কেএলসিসি, পেত্রনাস টুইন টাওয়ার এর পেছনে কেএলসিসি পার্কের মিউজিক্যাল ওয়াটার ফাউন্টেইন আর তাকে ঘিরে পর্যটকদের ভীড়ে অল্পকিছু সময় কাটিয়ে টুইন টাওয়ার এর কাছে আরও কিছু সময় কাটিয়ে এর মূল এনট্রেন্স পয়েন্ট হয়ে চারিপাশে ৩৬০° ঘুরে দেখে এমআরটি ধরে ফিরে এলাম চায়না টাউন। 

কিছুক্ষণ চাইনিজদের কিচিরমিচির এ কাটিয়ে আল বাইকে গেলাম ডিনার করতে। মালয়েশিয়ান স্টাইলের ফ্রাইড রাইস একেবারেই ভালো ছিলো না, আরও দুজন বাংলাদেশীর সাথে পরিচয় হলো। আল আমিন নামের নারায়ণগঞ্জ এর একজন শ্রমিক ভাই এর সাথে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা হলো, সেই একই দৃশ্যগল্পের পুনরাবৃত্তি যেন। সে আমার খাবারের বিল দিবেই দিবে, কোনমতে তাকে তা থেকে নিবৃত্ত করা গেলেও তার অনুরোধে লেমনেড আইস টি পাণ করতে হলো। রাত বারোটার আগে আগে হোটেলে ফিরলাম। মজার ব্যাপার, আমার সব ট্যুরে বাজেটের মধ্যে ভালো হোটেল খুঁজে পেতে আগোডা আর বুকিং ডটকম এ গবেষণা চালিয়ে রুম বুক দিলেও ট্যুরে প্রায় প্রতিদিন ভোরবেলা হোটেল হতে বের হয়ে রাত দশটা বারোটায় হোটেলে ফেরা হয়। তবুও হোটেল নিয়ে আমার খুতখুত স্বভাব থেকেই যাবে। কারণ, আমি মনে করি সারাদিন নানান চিত্তাকর্ষক স্থানে ভ্রমণ শেষে ক্লান্ত দেহ নিয়ে সুন্দর পরিষ্কার আরামদায়ক একটা হোটেল রুমে না ফিরতে পারলে সারাদিনের যে ভালোলাগা নিয়ে হোটেলে ফিরি, তা যেন মুহুর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। যাই হোক এখন কিছুক্ষণ লেখালেখি করে ঘুমাতে যাবো। আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় টিবিএস থেকে মেলাকার বাস ধরতে হবে।

মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ