ফুকেট থেকে ফিফি' - চমৎকার দিনটি
রিসিপশনে বসে নাস্তা পর্ব শেষ করে হোটেলের গলির মুখে থাকা ট্রাভেল এজেন্সির দোকানে গিয়ে দেখি দোকান খোলা, ট্রান্সপারেন্ট পলি দিয়ে সামনের দিকটা ঢাকা, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। সকাল ০৯:০০-০৯:১৫ এর মধ্যে আমাকে হোটেল হতে পিক করার কথা শেয়ারড মাইক্রো বাস এর যা আমাকে নিয়ে যাবে Rassada Pier পর্যন্ত; যেখান থেকে আমি ধরবো ফি ফি'র ফেরি। ৬০০ বাথে গতকাল হোটেলের কাছে হতে এই টিকেট করা ছিলো এবারের ট্যুরের সবচেয়ে ভালো ডিল।
৯টা পেরিয়ে গেলেও গাড়ি বা ঐ দোকানে কাউকে দেখা না যাওয়ায় টেনশনে পড়ে গেলাম। শেষে গলির মুখে থাকা ম্যাসাজ পার্লারের মেয়েগুলোর মধ্যে থেকে একজনকে আমার সমস্যার কথা বুঝিয়ে বললে সে আমার কাছে থাকা রশিদ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে কল দিলো তার মোবাইল থেকে। লোকাল ল্যাংগুয়েজে কথা বলে জানালো গাড়ী ১৫ মিনিটে চলে আসবে, রওনা দিয়েছে। আমার সাথে সেই পার্লারের সামনে আরও একটা পর্যটক গাড়ি অপেক্ষায় ছিলো, তার সাথে গল্প শুরু করলাম। আর্জেন্টাইন ছেলেটা বাংলাদেশ শুনে গল্প শুরু করলো। ম্যারাডোনা, মেসি থেকে আমার ব্রাজিলের ডাইহার্ড ফ্যান হওয়া, রোমারিও-বেবেতো থেকে শুরু করে রুডখুলিত সব চলে আসলো মিনিট পাঁচেকের গল্পে। নয়টা বিশের দিকে একটা ছেলে হাতে কাগজ নিয়ে এসে আমাদের জিজ্ঞাস করে আমার হদিশ খুঁজে পেল, সে গাড়ী নিয়ে অনেকটা সামনে চলে গেছে। ভেবেছিলাম আমি আর আর্জেন্টাইন একই গাড়ীর যাত্রী, গাড়ী এবং ফেরি'র সময়টুকু গল্প করে কাটবে। কিন্তু না, তার গাড়ী ভিন্ন, তাকে রেখে সদ্য আসা ছেলেটার সাথে মিনিটখানেক হেঁটে মাইক্রো বাসের শেষ সিটে গিয়ে বসলাম শেষ যাত্রী হিসেবে।
সোয়া দশটার দিকে রাসাদা পিয়ের এ পৌঁছে গেলাম। রশিদ দেখিয়ে চেকইন কাউন্টার থেকে টিকেট টোকেন নিয়ে নিলাম। গেট ২ হতে আমাদেফ ফেরি ছাড়বে এগারোটার দিকে। অপেক্ষার পালায় সামনে থাকা ফুডকোর্ট থেকে পানি আর একটা কফি ল্যাতে নিয়ে অপেক্ষায় রইলাম। এই ফাঁকে চ্যাটার্জিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ফেরিতে কোন পাশে বসিবো? সে জানাইলো বাম পাশে। সাড়ে দশটায় গেট ওপেন করলে শুরুতেই প্রবেশ করে দেখি আগের ফেরির জন্য ওপেন করে কিছু যাত্রী আগে থেকেই বসে আছে। কিন্তু তারা বসেছে ডানপাশে, কারণ বামপাশে রোদ পড়ছে। সাদা চামড়ার এদের কান্ডকারখানা আমাদের বুঝের বাইরে। গায়ের সব কাপড় খুলে রেখে রোদ মাখতে শুয়ে থাকবে সৈকতের বালুকাবেলায়। আর এখন রোদ থেকে বাঁচতে ছায়ায় বসা কেন রে বাপ,? যাই হোম আমি বামপাশে জানালা খোলার অপশন থাকা একমাত্র সিটটি ফাঁকা পেয়ে গেলাম। ডাবল সিট দখল করে আয়েশে পুরো পথটুকু ভ্রমণ করা যাবে।
বেলা এগারোটার পরে যাত্রা শুরু করলো আমাদের ফুকেট থেকে ফিফিগামী ফেরিটি। আন্দামান সাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা অজস্র ছোট বড় টিলাসদৃশ পাহাড়ের সারি আর নীল জলের মিতালি দেখতে দেখতে ছবি তোলা হলো অনেক। আমার পাশে মাঝখানের সারিতে এক ইউরোপীয় দম্পতি বসেছে তাদের কয়েকমাস বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে। বাচ্চা কাঁদতে শুরু করলে তাকে হাতে নিয়ে দোল খাওয়াচ্ছে। এদের দেখেই ভালো লাগে, ভ্রমণপ্রিয় কতটা হলে এত্তটুকুন বাচ্চা নিয়ে সুদূর ইউরোপ থেকে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেড়াতে আসে।
যাই হোক, দুপুর একটার দিকে পৌঁছে গেলাম ফিফি আইল্যান্ডে। জেটি হতে বের হয়ে গুলবাজ মামাকে হোটেলের পথ জিজ্ঞাসা করার ফাঁকে দেখি জেটিতে দাঁড়িয়েই হোটেল দেখা যায়। মিনিট তিনেক হেঁটে পৌঁছে গেলাম ফিফি আইল্যান্ড এর বিখ্যাত এবং প্রাচীনতম হোটেল "Hotel Phi Phi" তে। চমৎকার হোটেলের রুমে ঢুকতেই মন ভালো হয়ে গেল রুমের লাগোয়া বারান্দা হতে চমৎকার ভিউ দেখে। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে হেঁটে চলে গেলাম "Papaya Restaurant" এ; মুসলমান ভারতীয় পরিচালিত হালাল হোটেল। তিনবেলা পরে জাতের খাওয়া কপালে জুটলো। চ্যাটার্জি'র রেকমেন্ড করা "পাপায়া রেস্টুরেন্ট (হালাল)" গুলবাজ মামা দেখালো ২৭০ মিটার দূরেই। মিনিট পাঁচেক হেঁটে চলে গেলাম সেখানে। ভারতীয় ওয়েটারের পরামর্শ নিয়ে অর্ডার করলাম সাদা ভাত আর চিকেন কারি। স্টিকি রাইস আর থাই স্যুপ এর স্বাদে চিকেন কারি মুখে দিয়েই মজা লাগলো। তাই এত্তুটুকুন ভাত এর সাথে আরেকটুকুন ভাত নিয়ে তৃপ্তি করে খেলাম।
খাওয়া শেষে সরু গলিপথ ধরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ছবি তুলে হোটেলে চলে এলাম। রোদের তেজ কমলে বের হবো, আজকের প্ল্যান ফিফি ভিউ পয়েন্ট ১,২,৩ এবং ভিউ পয়েন্ট ৩ থেকে সূর্যাস্ত দেখা। বিকেল সাড়ে চারটার পরে হোটেল হতে বের হয়ে হাঁটা শুরু করলাম আড়াই কিলোমিটার দূরের ৫০০ ফিট উঁচু ট্রেইল ধরে ভিউপয়েন্ট ২ এর দিকে। প্রায় দেড়ঘন্টা হেঁটে, ঘামে ভিজে, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে পৌঁছে গেলাম ভিউ পয়েন্ট ২ এ। ৫০ বাথ দিয়ে টিকেট কাটতে হলো, টিকেটের গায়ে লেখা এই অর্থ ভিউ পয়েন্ট এর আশেপাশের এলাকার প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় ব্যয় করা হবে।
ভিউ পয়েন্ট গিয়ে দেখি শ'দুয়েক পর্যটক ইতোমধ্যে এসে বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমি খুঁজে পেয়ে ফাঁকা উচু একটা স্থানে বসে পড়লাম ছোট্ট একটু ছায়া খুঁজে। এরপর অনেক অনেক ছবি তোলা, সূর্যাস্ত দেখা শেষ করে যে রাস্তা ধরে গিয়েছি সেটাতে না গিয়ে ভিন্নপথে বিপরীত দিকের পথ ধরে নীচে নামা শুরু করলাম। আধঘন্টার বেশী সময়ে সেই পথ ধরে নামার সময় একটা দোকান থেকে পাকা আমের প্যাকেট কিনে নিলাম ৬০ বাথে, হাঁটতে হাঁটতে আম খেতে খেতে চলে এলাম হোটেলে। ফিফির প্রধান আকর্ষণ ছিলো ভিউ পয়েন্ট ২ হতে ডাবল বিচ ভিউ। মূলত দুটি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ক্যানেল মতো বের হতে গিয়েও প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় থেমে গেছে। ফলে শখানেক মিটারের ব্যবধানে দুপাশে দুটি বিচ: Tonsai এবং Loh Dalum যেখানে প্রথমটিতে অবস্থিত ফিফি'র জেটি।
এরপর রাতের ফিফি ঘুরে দেখা, Loh Dalum বিচে ফায়ার গেম দেখা, পাপায়া রেস্টুরেন্টে রাতের ডিনার শেষ করে আমি যখন হোটেলে ফিরছি তখন ফি ফি জেগে উঠছে তার উন্মত্ততা প্রকাশে। রাতের ডিনারে ছিলো দুপুরের সেই ভারতীয় মালিক শান এর "Papaya Restaurant"। সেখানে গিয়ে থাই মেন্যু অর্ডার করলাম "Chicken Coconut Galangal Lemon Soup আর Fried Rice on Pineapple with Vegetables... দুটোই সুস্বাদু ছিলো তবে স্যুপটা ৯/১০, আদার বাইটগুলো আমার টেস্ট বাডের সাথে যায় না বলে ১ কম দিলাম। তবে এই স্যুপ আমার স্যুপের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিলো। প্রিয় অন্য দুটি স্যুপ হলো থাই স্যুপ আর খ্রিম অফ মাশরুম।

মন্তব্যসমূহ