লাংকাউই স্কাইব্রিজ, কিলিম ফরেস্ট এবং অন্যান্য (মালয়েশিয়া ভ্রমণ - দিন ০২)
গতকাল রাতে প্ল্যান ফাইনাল করে রেখেছিলাম "kilim geoforest park" ট্যুরে যাবো না। তাই সকাল সাড়ে ন'টায় হোটেলের লবিতে এসে গ্রাব কল করলাম স্কাইব্রিজ যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গাড়ি চলে আসলে উঠে বসতেই বছর পঞ্চাশের উপরের বয়স্ক চালক জানালেন আজকে স্কাইব্রিজ ওপেন হবে দুপুর বারোটার পরে। কি করা যায়, উনার সাথে পরামর্শ করতে উনি বললেন kilim geoforest park প্যাকেজ ট্যুরে ঘুরে আসার জন্য, যদিও হাতে সময় কম। প্রথম কাজ করে দিলেন গ্রাব ডেস্টিনেশন চেঞ্জ করে, তারপর ফোন করলেন কাকে যেন, ১০টায় বোট ছাড়বে, দ্রুত চলে আসতে বললো ওপাশ থেকে। বোট ছাড়বে "Tanjung Rhu Sea Beach" এর নিকটস্থ জেটি থেকে। খুশী হলাম, কারণ আজকের প্ল্যানিং এ ছিলো সুন্দর এই সৈকত ভ্রমণের। লাংকাউই ভ্রমণের প্রধান তিনটি রিকমন্ডেড সিবীচ হলো Pantai Cenang, Tanjung Rhu এবং Black Sand Beach খ্যাত "Pantai Pasir Hitam"। আজকে প্রথম দুটি দেখেছি, আগামীকাল বিকেলে ফ্লাইট লাংকাউই থেকে পেনাং এর। হাতে যেহেতু সময় আছে, ইচ্ছে আছে আগামীকাল সকাল সকাল Black Sand Beach টাও ঘুরে দেখার। আর হ্যাঁ, Pantai Cenang এর লাগোয়া বীচ Pantai Tengah যেখানে আজ সূর্যাস্ত দেখেছি; বিখ্যাত প্যারাগ্লাইডিং, জেট স্কি সহ নানান ধরনের ওয়াটার এক্টিভিটির জন্য।
যাই হোক, সকাল ঠিক ১০টার মধ্যেই আমার গ্রাব চালক ভাইটি আমাকে নিয়ে পৌঁছে গেল Tanjung Rhu জেটি ঘাটে, পরিচয় করিয়ে দিলো "Royal Mangrove Boat Tour" এর টিমের সাথে। নানান দেশীয় পনেরো জনের মতো টুরিস্ট নিয়ে রওনা দিলো আমাদের বোট, গাইড বছর পয়ত্রিশ এর "হাসান"। আমাদের প্রথম গন্তব্য Kilim Geoforest Par। দুপাশে ম্যানগ্রোভ বনের মাঝে দিয়ে আন্দামান সাগরের নীলচে সবুজ জল ভেদ করে লাফিয়ে লাফিয়ে চললো আমাদের বোট। বসেছিলাম একেবারে সম্মুখে, ভালো ভিউ দেখা এবং ছবি তোলার জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বেশী ঝাঁকুনি লেগেছে আমারই; ব্যাকপেইন আর L6-L7 এর রোগী, ভয়ে ছিলাম। যাক তেমন কোন ব্যাথা পরবর্তীতে বোধ করি নাই এখনো।
Kilim Karst Geoforest Park মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপের একটি ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রাকৃতিক বিস্ময়। এখানে চুনাপাথরের পাহাড়, ম্যানগ্রোভ বন, স্বচ্ছ নদী ও জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। বোট ট্যুরে ভ্রমণকারীরা ঈগল ফিডিং, ব্যাট কেভ এবং ক্রোকোডাইল কেভ ঘুরে দেখতে পারেন। ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে এর গুরুত্ব অনেক। শান্ত পরিবেশ, নীল আকাশ ও সবুজ প্রকৃতি এটিকে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করেছে। লাংকাউই ভ্রমণে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিলো ব্যাট কেইভ আর ক্রোকোডাইল কেইভ। যদিও জোয়ারের কারণে ক্রোকোডাইল কেইভে ঢুকতে পারি নাই। এরপর গেলাম বানরদের আড্ডাখানায়। পুঁচকে পুঁচকে বানরের দল, সেখান হতে দুটি চলে আসলো আমাদের নৌকায়, এসে পানির বোতল ছিনিয়ে নিলো এক ইউরোপীয় মেম সাহেবের। সেখান হতে পরবর্তী গন্তব্য ঈগল ফিডিং পয়েন্ট এ। ঝাঁকে ঝাঁকে ঈগল মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে। ট্যুর অপারেটিং বোটের গাইডরা পানিতে খাবার ছুঁড়ে দেয়, আর সাথে সাথে আকাশ থেকে অসংখ্য ঈগল নিচে নেমে এসে শিকার করে—দৃশ্যটা সত্যিই অসাধারণ। এখানে দেখা যায় Brahminy Kite (লালচে-বাদামী রঙের ঈগল) এবং White-bellied Sea Eagle মূলত। সবশেষে নিয়ে গেল ফ্লোটিং রেস্টুরেন্টে, রোজা ছিলাম, তাই ছবি তুলে আর এক কর্ণারে চেয়ারে বসে আন্দামান সাগরের নীল জলের রূপসুধা পাণ করলাম। লাংকাউইর এই এলাকার ঠিক উল্টো দিকে থাইল্যান্ডের ফুকেটের বর্ডার; মাদক চোরাকারবারিদের উৎপাত রয়েছে বলে জানালেন আমাদের গাইড। রেস্টুরেন্টে ব্রেক শেষে আমাদের নিয়ে বোট ফিরে এলো তানজুং র জেটি ঘাটে। সেখান হতে ৫০০ মিটার এর মতো হেঁটে দুপুর বারোটার পরে চলে এলাম Tanjung Rhu এর অপূর্ব সুন্দর সৈকতে। বেশ কিছু চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ ছবি নিয়ে গ্রাব কল করলাম স্কাইব্রিজ যাওয়ার জন্য। মিনিট দশেক এর কম সময়ে গাড়ী চলে আসলে রওনা দিলাম লাংকাউই এর মূল আকর্ষণ স্কাইব্রিজ এর উদ্দেশ্যে।
বেলা একটায় সেখানে পৌঁছে প্রবেশমুখেই Oriental Village এ জোহরের নামাজ পড়ে নিলাম। এরপর সেখানে কিছু ছবি তুলে টিকিট কাউন্টার থেকে Sky Cable Car এবং Sky Bridge এর টিকেট কেটে নিলাম ৮৫ রিংগিতে। সময় নিয়ে চারিপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে Base Station থেকে Middle Station গিয়ে অনেকটা সময় কাটালাম। এরপর Top Station গিয়ে ৩২৪ স্টেপের প্যারায় গেলাম না আপহিল ডাউনহিল করে পায়ের পুরনো ব্যাথাকে মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ করে দিতে। ১০ রিংগিতে Sky Gilder এর টিকেট কেটে নিলাম। স্কাই ব্রিজ থেকে চারিপাশের আন্দামান সাগেরর নীল জলের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপগুলোর ভিউ সত্যি অসাধারণ। স্কাইব্রিজ এর একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অনেকটা সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি আল্লাহর তৈরী অপূর্ব প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপ।
এরপর ফেরার পালা, Sky Gilder এ উঠার সময় দেখা গতকাল পরিচয় হওয়া দুইভাই আকিব-রাকিব এর সাথে, অল্পের জন্য তারা বেঁচে গেছে। গতকালই তারা জানিয়েছিলো তারা বিকেলে আসবে স্কাইব্রিজে। কিন্তু স্কাইব্রিজে এন্ট্রির শেষ সময় দেখলাম বিকেল সাড়ে চারটা, সাথে নোটিশ দেখলাম রমজান উপলক্ষে পরিবর্তিত সময়সূচির; যে কারণে আজকে বেলা বারোটার পর স্কাইব্রিজ ওপেন হয়েছে। যাই হোক, স্কাইব্রিজ থেকে নামতে নামতে পাঁচটা বেজে গেল, Sky Gilder এ লম্বা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে। নেমেই থ্রিডি আর্ট গ্যালারিয়ে গিয়ে দেখি বন্ধ হয়ে গেছে;পাঁচটা শেষ সময়। কি করা, গ্রাব কল করলাম, উদ্দেশ্য পেন্তাই এর লাংকাউইর Pantai Cenang এলাকায় অবস্থিত আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড এর জন্য। এটি মালয়েশিয়ার অন্যতম বড় অ্যাকুরিয়াম। এখানে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির সামুদ্রিক ও স্থলজ প্রাণী দেখা যায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ১৫ মিটার লম্বা টানেল অ্যাকুরিয়াম, যেখানে হাঁটতে হাঁটতে মাথার ওপর দিয়ে হাঙর, স্টিংরে ও বিভিন্ন মাছ সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এছাড়া পেঙ্গুইন সেকশন, ট্রপিক্যাল ফিশ জোন এবং রেইনফরেস্ট সেকশনও দর্শনার্থীদের জন্য খুবই উপভোগ্য। কিন্তু কপাল খারাপ, এটাও বন্ধ হয়ে গেছে, বিকেল পাঁচটা ছিলো শেষ সময়।
কি আর করা? চলে এলাম পেন্তাই সেনাং সিবীচে। শেষ বিকেলের পুরোটা সময় অলস বসে কাটালাম, দেখলাম চারিদিকে নানান দেশীয় পর্যটকদের সরব উপস্থিতি; নানান ওয়াটার স্পোর্টস, বীচ ভলিবল, সানবাথে ব্যস্ততা। আমার উদ্দেশ্য সূর্যাস্ত দেখা, দেখলাম, কিন্তু খুব আহামরি কিছু মনে হয় নাই। সূর্যাস্ত শেষে আজকের ইফতারের জন্য বিখ্যাত Cenang Street Food এর আশ্রয় নিলাম। ৫ রিংগিত করে ৩/৪ পাতলা স্লাইস পেপে (বিস্বাদ), আম (পানসে টক) আর লেমন জুস (স্বাদ নাই, পানি পানি)। ১৫ রিংগিত জলে গেল। তার চেয়ে সাড়ে ছয় রিংগিতে নেয়া ফিসবল স্টিক (০৪ পিসের) ২.৫০ রিংগিত, ফিস সসেজ (৩ রিংগিত) আর পানির বোতল (১ রিংগিত) খুব সুস্বাদু এবং হেভি ছিলো। পেট ভরার মতই ইফতার। মোবাইলে চার্জ ছিলো না, ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখছি স্মৃতি হিসেবে।
আমার হোটেল হলো পেন্তাই সেনাং থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে কুয়াহ'র একেবারে কেন্দ্রে, ঈগল স্কয়ার আর মাহাটাওয়ার থেকে ১ কিলোমিটার দূরে। আমার রুমের জানালা দিয়ে মাহাটাওয়ার আর তার পেছনের সমুদ্র এবং পাহাড় দেখা যায়। সমস্যা একটাই হোটেল হতে বেশীরভাগ ডেস্টিনেসন এ যেতে ২২-২৫ রিংগিত ভাড়া গুনতে হচ্ছে প্রতিবার রাউন্ড ট্রিপে ৫০ রিংগিতের মতো, মানে ১৫০০ টাকা!!! 😭 এইবার ফকির হইয়াই দেশে ফিরুম।

মন্তব্যসমূহ