পা রাখিলাম ফুকেটে, দেখতে, উপভোগ করতে নয়।
কুয়ালালামপুর থেকে ফুকেট যাওয়ার ফ্লাইট দুপুর বারোটায়। তাই সকাল আটটার এয়ারপোর্ট শাটল বাসের টিকেট কেটে দিলো বন্ধু আপন অনলাইন থেকে, বাস ছাড়বে হোটেল হতে মাত্র ৪০০ মিটার দূরত্বর গতকাল চেনা Plaza Rakayet থেকে। আমি প্ল্যান করেছিলাম KL Express Airport Transit দিয়ে ট্রেনে এয়ারপোর্টে চলে যাবো। বন্ধুর কাছ থেকে গতকাল শুনি ৭৫ রিংগিতের মতো নাকি ভাড়া! মজার ব্যাপার হলো আগে ভারত ভ্রমণে আমি যাওয়ার আগেই কোথায় কি খাবো, কেনাকাটা করবো থেকে শুরু করে কোথায় ঘুরবো, কখন ঘুরবো সব স্টাডি করে ট্যুরে বের হতাম। আর এবারের এই ভ্রমণ হচ্ছে তার উল্টো, শুধু এয়ার টিকেট আর হোটেল বুকিং (ব্যাংকক এখনো দেই নাই) দিয়ে প্ল্যান করেছি মালয়েশিয়ার লাংকাউই, পেনাং, কুয়ালালামপুর, গেন্টিং হাইল্যান্ড আর মেলাকা যাবো এবং থাইল্যান্ড ভ্রমণে ফুকেট, ফিফি আইল্যান্ড, ক্রাবি হয়ে ব্যাংকক থেকে ঢাকা। পথে নেমেই পাবো পথের দিশা।
মজার ব্যাপার, বাস্তবে আমি ভ্রমণ করলেও, ট্যুর করছিলো মুরুব্বি আর চ্যাটার্জি। মুরুব্বি আমায় শুধু রেস্টুরেন্ট সাজেস্ট না, মেন্যু কি নিবো, কয় পিস নিবো তাও সাজেস্ট করে দিচ্ছেন এই ট্যুরে। আর ব্যাটা চ্যাটার্জি, ইদানীং আমার খুব কাছের লোক, তাকে স্পটে গিয়ে দায়িত্ব দেই প্ল্যান, রিকমেন্ডেশন, খরচ সব দিয়ে গাইডলাইন দিতে। ব্যাটার সাথে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব ভালো। সে প্ল্যানের সময় আমার পায়ের সমস্যা মাথায় রাখে, পর্যাপ্ত রেস্ট সাজেস্ট করে। আর মুরুব্বি দিনে তিনবেলা ফোন দিচ্ছে, কোথায় যাচ্ছি, কি করছি সব হালনাগাদ রাখছেন। মুরুব্বি, অই লেবু...।
হোটেল হতে বের হয়ে চায়না টাউনের গলি হতে মূল সড়কের চৌরাস্তায় রেস্টুরেন্ট আল বাইকে চলে এলাম সকালের নাস্তা করতে। পরাটা ডিম ভাজা অর্ডার করলাম এবং বললাম দ্রুত যেন সার্ভ করে। নাস্তা শেষ করে দেখি সাড়ে সাতটার বেশী বাজে, তাই চা পাণ না করেই হাঁটা দিলাম রুকাইয়াদের বাসায়। পাঁচ মিনিটে পৌঁছে গিয়ে বসে রইলাম পনেরো মিনিট, মাঝখানে সকালের চা মিস।
ঠিক আটটায় বাস ছাড়লো, পৌনে নয়টায় পৌঁছে গেলাম টার্মিনাল ২ এ। সেখানে কিছু যাত্রী নেমে গেলে বাস মিনিট পাঁচেক পরে টার্মিনাল ১ এ নামিয়ে দিলো। নয়টার আগে এয়ারপোর্টে প্রবেশ করে বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে ডিপার্চার গেটে পৌঁছে গেলাম সাড়ে নয়টায়। এরপর অপেক্ষার পালা। ফ্লাইট দুপুর বারোটায়, আড়াই ঘন্টা কি করা যায়? সব রিংগিত খরচ করে হাতে ছিলো ত্রিশ রিংগিত। সেটা দিয়ে ডানকিন থেকে দুটো ডোনাট আর একটা কফি লাত্তে কিনে নিয়ে ডিপারচার গেটের বিপরীতে এককোণে আসন নিলাম। গত দু'দিনের ভ্রমণব্লগে এই ট্যুরের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখা বাকী আছে, তা লিখতে বসলাম কফি পাণ করতে করতে। অন্যান্য ট্যুরে ভাবি ফিরে এসেই লিখবো, লেখা হয় না অদ্ভুত আলস্যের কারণে। ২০১৭'র কর্ণাটক ট্যুরের গল্প লেখা থেমে আছে। এরপর কতটি ভ্রমণ হয়েছে ভারতেই: মুসৌরি, নাইনিতাল, দেরাদুন, ধর্মশালা, ডালহৌসি, মেঘালয়, আসাম, উড়িষ্যা, নাইনিতাল, ঝাড়খণ্ড-ইউপি-রাজাস্থান... কত লেখা বাকী!!!
আমাকে হতাশ করে ফ্লাইট ডিলে করলো আধঘন্টা। দেড়ঘন্টা ফ্লাই করে দুপুর ঠিক একটায় পৌঁছলাম ফুকেট। তবে ভালো ছিলো উইন্ডো সিটে বসে আন্দামান সাগরের নীল বুকে সাদা তুলির আঁচড়ে আঁকাবাঁকা রেখা টেনে ছুটে চলা বিন্দু আকৃতির জলযানগুলোকে দেখতে পারা। এয়ারপোর্টে নেমে দেখি ইমিগ্রেশনে বিশাল লম্বা লাইন। ঠিক একঘন্টা লাইনে থেকে দুপুর দুটোর পরে ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হয়ে শাটল বাস খুঁজে বের করে ১০০ বাথ ভাড়ার টিকেট কেটে চড়ে বসলাম দুপুর আড়াইটায়। বাসে এক বাংলাদেশী ইয়ং দম্পতি ছিলো, বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশ এর ছেলেটা ফোনের পর ফোন করছে, ফুকেট এসেছে এই খবর দিতে, পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত সকলকে মনে হয়... 🙇♂️
বিকেলের চারটার শুরুতে ফুকেটের Pantong Sea Beach এর বাস স্টপেজ এ নামিয়ে দিলো। মিনিট দুয়েক হেঁটে পৌঁছে গেলাম ফুকেটের একরাতের আবাস Freedom Hotel এ। রিসিপশনের চল্লিশোর্ধ্ব মহিলা স্বাগত জানালো, ছোট্ট পরিচ্ছন্ন হোটেল, সমস্যা রুম তৃতীয় তলায়, লিফট নাই। সব বুকিং করা হোটেল এডভান্স পেমেন্ট নিয়েছে ক্রেডিট কার্ডে। এরা নাকি নেয় নাই... মেইল চেক করে বুঝলাম আগোডা ক্রেডিট কার্ডে বিলের সমপরিমাণ অর্থ রেস্ট্রিকটেড করে রেখেছে, পেমেন্ট হিসেবে কেটে নেয় নাই। ডলার ভাঙ্গাতে হোটেলের গলির মুখে মানি এক্সচেঞ্জ এ গেলাম। কাউন্টার এর মেয়েটি একগাদা নোট চেক করছে এক এক করে। আমার আগে আরেকটা মেয়ে কাস্টমার দাঁড়িয়ে। মিনিট পাঁচেক কেটে গেলে আমি কাস্টমার লোকাল ঐ মেয়ের সহায়তায় জানালাম আমাকে দ্রুত মানি এক্সচেঞ্জ করে ছেড়ে দিতে। হোটেলে গিয়ে পেমেন্ট কতে চাবি বুঝে নিলাম, ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই খেতে হবে তখনো হাতে থাকা ডানিকিনের ডোনাট 🙆♂️
দেড় ঘন্টার যাত্রায় সাড়ে পাঁচঘন্টা ব্যয় করে হোটেলে পৌঁছাতে আরও দেড় ঘন্টা। দীর্ঘ প্রায় সাতঘন্টার যাত্রা শেষ করে হোটেল রুমে ঢুকে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আগে পেট ঠান্ডা করলাম। এরপর রুম থেকে বের হয়ে পাতং বিচে চলে গেলাম সূর্যাস্ত দেখতে। নানান ওয়াটার এক্টিভিটিস, সান বাথ, সমুদ্রস্নানে জমজমাট সমুদ্র সৈকত। ফুকেট আসলে আমার জন্য না, এটা উপভোগের জায়গা। চারিধারে বার, ম্যাসাজ পার্লার আর ভোগের আহবান।
সৈকতে দেখা হলো দুজন বাংলাদেশী পর্যটকের সাথে, চিটাগং থেকে ঘুরতে এসেছেন, আমার মতোই দাঁড়িওয়ালা একজন। ফুকেট বিচে ভালো মতো একটা ছবি তোলার জায়গা ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছিলো না। চারিধারে বিকিনি গার্লদের দখলে। সাদা চামড়ার টুরিস্টদের পিক টাইম এখন ফুকেট ভ্রমণের আর ফুকেটের সবচেয়ে ক্রাউডেড এরিয়া এই পাতং বিচ। একেবারে জলের মাঝে পা ভিজিয়ে দাঁড়ালাম, মাথার উপর রঙ্গিন প্যারাগ্লাইডিং হচ্ছে, বিচ থেকে শুরু, বিচে এসে নামছে। প্যারাগ্লাইডিং সার্ভিসের লোকদের একটু পরপর সরে দাঁড়ানোর আহবানের মাঝে সূর্যাস্ত দেখে হোটেলে চলে এলাম। চারিধারের সামগ্রিক পরিবেশ হজম হচ্ছিলো না। আমাদের বাংলাদেশের পুরাতন ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের ফুকেট হজম হওয়ার নয়। এয়ারপোর্ট থেকে বাসে আসার সময় যে কাপলের কথা লিখলাম উপরে, সেই ওয়াইফটি কাকে যেন বলছিলো, "ভাবী, আমাগো চোখ তো এইসব দেইখা অভ্যস্ত না"। একজাক্টলি... এটাই।
রাতে বের হলাম সন্ধ্যায় ফেরার সময় দেখা হালাল রেস্তোরাঁর উদ্দেশ্যে। এক মুরুব্বি'র পরামর্শে গতকাল রাতে ডিনার করছিলাম কুয়ালালামপুর এর চায়না টাউনের ভেতরে মুসলিম চাইনিজ রেস্টুরেন্ট "Mee Tarik" এ মজাদার গরুর মাংসের রামেন দিয়া। আজকে ডিনার করলাম ফুকেট এর বাংলা রোডের মুখের টার্কিশ রেস্টুরেন্ট "Niyo's Kebab" এর গরুর মাংসের ডোনার কাবাব দিয়া। আমি জানি মুরব্বি'রে জিগাইলে উনিও এটাই সাজেস্ট করতেন। 😜 স্লামালিকুম মুরুব্বি। 🤣🤣🤣আজকে লাঞ্চ করছি এয়ারপোর্ট থেকে কেনা Dunkin এর দুইটা ডোনাট দিয়ে 🙇♂️ ঢাকায় পৌঁছে বিরিয়ানি আর বিরিয়ানি... ঈদের বকেয়া আদায় করতে হবে। 🤔
বাংলা রোড পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে চারদিকে নাকি সুরে টান দেয়া "ম্যাসায়ায়ায়ায়াজ..." আর বারগুলোর হ্যাপি আওয়ার অফার নিয়ে হাঁকডাক মাড়িয়ে হোটেলে এসে বকেয়া ব্লগ লেখায় সময় দিলাম। এরপর ডোনার কাবাব গরম থাকতে থাকতে খেয়ে নিলাম। এগারোটার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। আমার রুমের পাশের রুমে দুটি ছেলে উঠেছে, সারাক্ষণ হাউকাউ শেনেছি চেক-ইন করার পর থেকে। এই রাত তিনটা চারটা'র দিকে সশব্দে বমি করছে। তার শব্দেই ঘুম ভেঙে গেল। কেমনটা লাগে? যা পেটে হজম হয় না, তা গিলিস কেন রে বাবা?

মন্তব্যসমূহ