মেলাকার স্মৃতিময় ভ্রমণে শেষ এবারের মালয়েশিয়া ঘোরাঘুরি

কথায় আছে, "যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়"। একদিন আগেই MRT লাইনের ট্রেন চিনতে ভুল করে ১০ স্টেশন পরে গিয়ে মধ্য রাতে কি বিপাকে পড়েছিলাম, সে গল্প নিশ্চয়ই শুনেছেন কুয়ালালামপুরে কাটানো প্রথম দিনটি ছিলো জীবনের অন্যতম খারাপ ঈদের দিন এই পোস্টে। তাই আজ ভোররাতে যখন MRT স্টেশন এ গিয়ে ট্রেন ধরবো TBS এর যেখান থেকে সকাল সাড়ে সাতটায় আমার মেলাকার বাস। হোটেল রিসিপশনে রাতের বেলা থাকেন হোটেলের মালিক বয়স্ক ভদ্রলোক নিজে, সকাল হওয়া পর্যন্ত। উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই ভোররাতে একা একা মাসজিদ জামেক স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া রিস্কি কি না। উনি বললেন কিছুটা, কারণ সেই পথটা উড়ালসেতুর নীচের অংশ এবং ছিন্নমূল ভবঘুরেদের দেখা যায় সেখানে। উনি বললেন তুমি Plaza Rakayat হয়ে যাও, এটাতো কাছে। প্রথমে উনার উচ্চারণ বুঝতে পারি নাই, পরে গুগল ম্যাপে উনি টাইপ করে দিলে বুঝতে পারলাম, উনার উচ্চারণে যা শুনাচ্ছে তা হলো "রুকাইয়াহ"। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম Plaza Rakayat স্টেশনে। মজার ব্যাপার এখানেও দেখা মিললো ছিন্নমূল ভবঘুরেদের। সঠিক প্ল্যাটফর্মে গিয়ে সঠিক লাইনের ট্রেনে উঠলেও বিপত্তির শুরু এরপর। দু স্টেশন পরে ট্রেন চেঞ্জ করতে হবে Chan Saw Lin স্টেশন থেকে। যথারীতি ট্রেন থেকে নামলাম এবং বিপরীত পাশের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে অন্য ট্রেনে উঠার পর আবিষ্কার করলাম এটা ভুল ট্রেন। ট্রেনের সেই বগিতে থাকা একমাত্র বয়স্ক সহযাত্রী আমার কনফার্ম করলেন বিষয়টা। ততক্ষণে দরজা বন্ধ হয়ে ট্রেন চলতে শুরু করেছে, চলছে তো চলছেই। সাত মিনিট পরে পরবর্তী স্টেশন Kuchai নেমে সঠিক পথে ফেরার ট্রেন আসতে দেখাচ্ছে ৯ মিনিট বাকী। এর সাথে ৭ মিনিটের ট্রেন যাত্রা। ১৬ মিনিট আরও গেল। সব মিলিয়ে আধঘন্টা নষ্ট। গুলবাজ মামু (গুগল) যানাচ্ছে আমার TBS পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় ৭:৪৫ অথচ আমার বাস ৭:৩০ এর। 🙆‍♂️

আসলে সিঙ্গেল লাইনের মেট্রোরেল ব্যবহার করে অভ্যস্ত আমার মাথায় আসে নাই সে একই প্ল্যাটফর্মের একই লাইনে অন্য ট্রেন ধরতে হবে। এবার ব্যাপারটা ক্লিয়ার হলেও বিপদ যা হবার তো হয়ে গেল। গুলবাজ এর তথ্যমতে বাস মিস কনফার্ম। Chan Saw Lin স্টেশন নেমে সঠিক ট্রেনের যে বগিতে উঠলাম, দেখি বাংলাদেশের ৫ জন ছেলে সহযাত্রী, ওরাও TBS যাচ্ছে, মূল গন্তব্য ভিন্ন। ওরা আশ্বস্ত করছিলো সঠিক সময়েই পৌঁছে যাবো বলে। আধঘন্টা সময় নিজের আক্কেল সেলামি দিয়ে টেনশনে থেকে TBS টার্মিনালে পৌঁছে যখন বাস ছাড়ার নির্ধারিত গেট ৪ এ চলে আসলাম, তখন ঘড়িতে সোয়া সাতটা, বাস ছাড়ার পনেরো মিনিট বাকী। দশ মিনিট পরে বাস গেটে আসলে একে একে সকল যাত্রী বোর্ডিং করে বাস চলা শুরু করলো গতকাল ট্রেন হতে দেখা পুত্রাজায়া হয়ে।

আগের দিন রাতে মসজিদ জামেক স্টেশন হতে বের হয়ে হোটেলের দিকে যাওয়ার শুরুতে 7/11 থেকে কিছু রুটি, কেক টাইপের আইটেম কিনে রেখেছিলাম। বাস ছাড়ার মিনিট পনেরো পরে তার একটা আয়েশ করে খাওয়া শুরু করতেই চোখে পড়লো বাসের সম্মুখে টাঙানো নোটিশ, বাসে কোন ধরনের খাওয়া এলাও না। হাতে থাকা খাবার শেষ করে বাকিগুলো রেখে দিলাম। সকালের সূর্যালোকে বাস পুত্রাজায়ার দিকে ছুটে চললো। 

দু'ঘন্টা পরে সকাল সাড়ে নয়টায় মেলাকা সেন্ট্রাল টার্মিনালে বাস থেকে নেমে গ্রাব কল করলাম মেলাকার ডাচ স্কয়ারের জন্য৷ মিনিট দুয়েক পরে চলে এলেন এক পঞ্চাশোর্ধ মুসলিম মহিলা তার গাড়ী নিয়ে। অল্প পথের এই যাত্রার সময়টুকুতে পুরো সময় তার ড্রাইভিং ফ্রন্টে রাখা মোবাইলে চললো হিন্দি সিরিয়াল স্টাইলের মালয় কোন ড্রামা। সে থাকুক তার নাটক নিয়ে, ডাচ স্কয়ারে পৌঁছাতেই মন ভালো লাগায় ভরে গেল। World Heritage City ঘোষিত মেলাকা দেখে ভালো লাগলো। শুরুতেই একটা ওয়াল স্ট্রিট আর্টের ছবি তুলতে গিয়ে দেখা মিললো স্বল্প বয়সী এক তরুণীর, টিকটকার স্টাইলে ছবি তুলছে ট্রাইপডে মোবাইল সেট করে হাতে কন্ট্রোলার নিয়ে। তাকে অনুরোধ করায় সে আমার ছবি তুলে দিলো এবং আমিও তার দু একটা ছবি তুলে নিলাম চমৎকার কম্বিনেশন এবং তার দেয়া পোজ এর জন্য।

সাথে ছিলো আগের রাতে কেনা সেভেন ইলেভেনের কিছু ব্রেড টাইপ নাস্তা, সেগুলো দিয়ে নাস্তা করলাম। এই ফাঁকে চ্যাটার্জি'কে বলেছি আমার ফেরার বাস দুপুর আড়াইটায়। সেভাবে সে একটা সুন্দর ভ্রমণ পরিকল্পনা করে দেয়। সে একেবারে সময় ধরে ধরে সাজিয়ে দিলো কিভাবে ঘুরে দেখবো Dutch Square (Red Square), St. Paul’s Hill & Church,  A Famosa Fort & View Point, Jonker Street, Melaka Rivet Walk. তো আমি Famosa শেষ করে যখন ডাচ স্কয়ারের দিকে যাচ্ছি ফের তখন আমি শিডিউলের চেয়ে সময়ে অনেক এগিয়ে। এখানে দেখলাম একটা অবজারভেশন টাওয়ার আছে, সেখানে গিয়ে ২৬ রিংগিতে টিকেট করে ৭ মিনিটের পাখির চোখে মেলাকা দেখলাম। প্রথম তিন চার মিনিট চোখে দেখার সাথে সাথে দুই হাতে  মোবাইল এবং ক্যামেরায় ছবি তুললাম একসাথে। আমার পাশে এক সাদা চামড়ার ভদ্রলোক তার আট দশ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে বসেছে। পুরোটা সময় স্র ছেলেকে আশেপাশের বাড়িঘর দেখাচ্ছিলো, নানান ইতিহাস বলছিলো, গল্প করছিলো। আমি একদম ছবি তোলা বন্ধ করে ভাল করে চারিপাশে চোখ বুলালাম। 

আন্দামান সাগেরর নীল জলের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেলাকা(Melaka) মালয়েশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উপনিবেশিক ঐতিহ্যের এক অনন্য মিশেল, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সিটির স্বীকৃতি পেয়েছে। একসময় এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দর, যেখানে পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশ শাসনের ছাপ এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। শহরের প্রাণকেন্দ্র ডাচ স্কয়ার বা রেড স্কয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের ক্রাইস্ট চার্চ ও স্ট্যাডহুইস ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। সেন্ট পল’স হিলে উঠে শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়, আর নিচে এ ফামোসা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ অতীতের গল্প বলে। জনকার স্ট্রিট মেলাকার সাংস্কৃতিক হৃদয়—এখানে খাবার, সুভেনির ও স্থানীয় জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য একসাথে মেলে। মেলাকা রিভার ওয়াকের রঙিন দেয়ালচিত্র ও শান্ত পরিবেশ ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তোলে। বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব মেলাকার খাবারেও স্পষ্ট, বিশেষ করে নিয়োন্যা কুইজিন। স্বল্প সময়ের ভ্রমণেও মেলাকা এমন এক অভিজ্ঞতা দেয়, যেখানে ইতিহাস, স্থাপত্য ও স্থানীয় জীবনের এক অপূর্ব সমন্বয় অনুভব করা যায়।

ভ্রমণবন্ধু তাহিন হাসান এখানকার দামেস্কাস রেস্টুরেন্টে কিছু মাস্ট ট্রাই আইটেম সাজেস্ট করেছিলো মেসেঞ্জারে। গুগলম্যাপে গুলবাজ মামু দূরত্ব দেখাচ্ছে প্রায় ৫ কিলোমিটার যাওয়া আসা মিলে। সেখানে যাওয়ার প্ল্যান বাদ দিয়ে সাথে থাকা দু'ধরণের কেক দিয়ে সংক্ষিপ্ত লাঞ্চ পর্ব সেরে হাঁটা শুরু করলাম জনকার স্ট্রিট এর দিকে। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় জনকার স্ট্রিট হয়ে মেলাকা রিভার সাইড ওয়াকিং ট্রেইল ধরে হেঁটে বেড়ালাম। দেখলাম Kampung Kling Mosque। অনেক অনেক ছবি তুলে দুপুর সোয়া একটার দিকে এই চমৎকার শহর মেলাকা'কে বিদায় বলে গ্রাব কল করে রওনা হলাম মেলাকা সেন্ট্রাল TBS এর দিকে। 

কিন্তু অভাগা যেদিকে যায়, নদী শুকিয়ে যায়। নয়টার বাস কয়টায় ছাড়ে সত্য করে দিয়ে আড়াইটার বাস আসলো চারটার পরে, ছাড়লো সাড়ে চারটায়। কিছুক্ষণ চলার পর শুরু হলো জ্যাম, হাইওয়ের জ্যাম। দু'ঘন্টার যাত্রা চারঘন্টায় শেষ করে রাত সাড়ে আটটায় পৌঁছলাম কুয়ালালামপুর TBS। সেখান থেকে MRT ধরে গেলাম মাসজিদ জামেক স্টেশন, গন্তব্য বিখ্যাত মারদেকা স্ট্রিট ঘুরে দেখা। এখানে কিছু সময় কাটিয়ে ভাবছিলাম যাবো জালান স্ট্রিট ফুড দেখতে। কিন্তু আগামীকাল যেহেতু মালয়েশিয়াকে বিদায় জানিয়ে সকালেই রওনা হবো থাইল্যান্ড, তাই কিছু কেনাকাটা করা দরকার। হাঁটা দিলাম চায়না টাউনের দিকে। চায়না টাউনে পৌঁছে পড়লাম বৃষ্টিতে। দোকানের শেড ধরে হেঁটে নিজেকে যতটুকু পারা যায় না ভিজিয়ে চলে এলাম কুয়ালালামপুর এ আমার তিন রাতের আবাস এবং এবারের ট্যুরের সবচেয়ে ভুয়া হোটেল Hotel Nan Yeang এ। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম রাত দশটার পরে, প্রথমে গেলাম বন্ধু আপিনের রেকমেন্ড করা "Meh Tarik" চাইনিজ মুসলিম রেস্টুরেন্টে। গরুর স্যুপ নুডুলস এর একটা আইটেম এভেইলেবল ছিলো, সেটা দিয়ে ডিনার সেরে নিলাম। এরপর এর বিপরীতে অবস্থিত Komplks Selangor এর নীচের শপিং আউটলেট থেকে চকলেট আর ট্রাভেল ব্যাগ কিনে নিয়ে হোটেল ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমাতে গেলাম বারোটার পরে। 


মন্তব্যসমূহ

Translate

বোকা পর্যটকের কথা

মানুষ যেমন হঠাৎ করেই কারো প্রেমে পড়ে, ঠিক তেমনই করে আমিও প্রেমে পড়েছি ভ্রমণের। আজব এক নেশায় নেশাগ্রস্থ, কবে থেকে জানি না। তবে নিজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানে লড়াই করে টিকে থাকার পর ভ্রমণে মনঃসংযোগ করতে উদ্যত হই। সেই থেকে যখনই সময়-সুযোগ হয় বেড়িয়ে পড়ি ঘর হতে, ভ্রমণের তরে। মজার ব্যাপার হল, আমি সাইক্লিস্ট নই, সাঁতার কাটতে পারি না, না পারি ট্র্যাকিং, হাইকিং, ক্লাইম্বিং। কোন ধরণের এডভেঞ্চারধর্মী কোন গুণই আমার নেই, শুধু আছে ভ্রমণের শখ আর অদম্য ইচ্ছাটুকু। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সময় সময় আমার ঘুরে বেড়ানো আর সেই গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এই ডায়েরীতে। আমার এই লেখাগুলো বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লেখা ছিল; সেগুলো সব একত্রে সংরক্ষণ করে রাখার নিমিত্তেই এই ব্লগ। যদি আপনাদের কারো এই লেখাগুলো কোন কাজে লাগে তবে আমার পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।

পোস্ট সংরক্ষণাগার

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ